মাত্র ১৭ বছর বয়সে স্টকহোমের আকাশে জুলে রিমে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলেন এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো। সেই মুহূর্তেই ফুটবল বিশ্ব তাকে চিনেছিল নতুন এক নামে—পেলে (Pelé)। সেটি শুধু একটি বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি ছিল না, বরং ফুটবল ইতিহাসে তারুণ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘোষণাগুলোর একটি। প্রায় সাত দশক পেরিয়ে গেলেও ২০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পেরেছেন মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন। সেই পথের সূচনা করেছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি এই ফুটবলার।
২০২৬ বিশ্বকাপ সেই অভিজাত তালিকায় যুক্ত করেছে আরও দুটি নতুন নাম—লামিন ইয়ামাল (Lamine Yamal) এবং পাও কুবার্সি (Pau Cubarsí)। নিউইয়র্ক-নিউ জার্সির ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে দুজনই নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের তালিকায়। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ট্রফি হাতে তোলার সময় ইয়ামালের বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন, আর কুবার্সির বয়স ১৯ বছর ১৭৮ দিন।
তবে এই ইতিহাসের সূচনা পেলের হাত ধরেই। ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে আজও তিনি সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার। শুধু শিরোপা নয়, সেমিফাইনালে হ্যাটট্রিক এবং ফাইনালে জোড়া গোল করে তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন—ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। সেই রেকর্ড এখনও অক্ষত রয়েছে।
পেলের পরের অবস্থানে রয়েছেন ব্রাজিলের আরেক কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিও (Ronaldo Nazário)। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের সময় তার বয়স ছিল ১৭ বছর ২৯৮ দিন। যদিও সেই আসরে মাঠে নামার সুযোগ হয়নি, তবুও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলের সদস্য হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেন। চার বছর পর তিনিই হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার এবং ‘দ্য ফেনোমেনন’ নামে ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে যান।
১৯৮২ সালে ইতালির বিশ্বজয়ী দলে ১৮ বছর ১৭৪ দিন বয়সে রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন জিউসেপ্পে বার্গোমি। এরপর রয়েছেন ব্রাজিলের কৌতিনহো, যিনি ১৯৬২ সালে ১৯ বছর ৬ দিন বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হন। একই আসরে সতীর্থ মার্কো আন্তোনিওর বয়স ছিল ১৯ বছর ১৩৫ দিন। তালিকায় আরও আছেন ইতালির সান্দ্রো মাজ্জোলা (১৯ বছর ৩০৯ দিন), উরুগুয়ের রুবেন মোরান (১৯ বছর ৩৪৪ দিন) এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে (১৯ বছর ২০৭ দিন)। কৈশোরের শেষ প্রান্তেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন তারা।
২০২৬ সালে এই গৌরবময় তালিকায় নতুন অধ্যায় লিখেছে স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের তারুণ্যনির্ভর দল অভিজ্ঞতা ও যুবশক্তির দুর্দান্ত সমন্বয়ে বিশ্বকাপ জিতে নেয়। সেই দলের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন ইয়ামাল। মাত্র ১৯ বছর ৬ দিন বয়সেই তিনি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রথম টিনএজার হিসেবে ইউরো ও বিশ্বকাপ—দুটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জয়ের কীর্তি গড়েছেন। আধুনিক ফুটবলে এমন অর্জন আর কারও নেই।
স্পেনের আরেক বিস্ময় পাও কুবার্সিও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। মাত্র ১৯ বছর ১৭৮ দিন বয়সে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি তিনি জিতেছেন আসরের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে তার পরিণত রক্ষণভাগের নেতৃত্ব ফুটবল বিশ্বকে মুগ্ধ করেছে। ফাইনালে ১২১টি সফল পাস দিয়ে তিনি গত ছয় দশকের বিশ্বকাপ ফাইনালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল পাসের রেকর্ডও গড়েছেন।
শুধু শিরোপা নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল তরুণদের নিজেদের প্রতিষ্ঠারও মঞ্চ। আসরের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার ছিলেন মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা। তার পরেই ছিলেন ফ্রান্সের ইব্রাহিম এমবায়ে, আর্জেন্টিনার ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুওনো, স্পেনের লামিন ইয়ামাল এবং পাও কুবার্সি। বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এই কিশোর-তরুণদের আত্মপ্রকাশই ইঙ্গিত দিচ্ছে—আগামী এক দশকের ফুটবলকে নেতৃত্ব দেবে এই নতুন প্রজন্ম।


