তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক গোপন রাখতে বাবাকে সরকারি কাজের প্রলোভন, এমপি নজরুলকে নিয়ে চালকের দাবি

এক তরুণীর সঙ্গে ‘অ’\বৈধ’ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিষয়টি গোপন রাখার বিনিময়ে তাঁর বাবা মাসুম বিল্লাহকে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়েছিলেন সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম (Gazi Nazrul Islam)। মাসুম বিল্লাহকে কোটিপতি বানিয়ে দেওয়ার আশ্বাসও তিনি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এমন দাবি করেছেন গাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান (Obaidur Rahman)। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থের লোভে ওই তরুণীর মা–বাবা সংসদ সদস্যের সঙ্গে মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি করেননি। বরং বিষয়টি গোপন রেখে এর বিনিময়ে নানা সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা চলছিল।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় মুঠোফোনে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন ওবায়দুর রহমান। এরই মধ্যে তিনি গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হ’\ত্যা’\চেষ্টার অভিযোগ এনে থানায় মামলা করেছেন।

সম্পর্কের দিক থেকে ওবায়দুর ওই তরুণীর মামা। গাজী নজরুল ইসলামের গাড়ি চালানোর পাশাপাশি মেয়েটির বাবার সূত্রেও সংসদ সদস্যের সঙ্গে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। ওবায়দুর জানান, গাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহর খালু। সে হিসাবে ওই তরুণী গাজী নজরুলের নাতনি সম্পর্কের আত্মীয়।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami) থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বয়স ৭৫ বছর। সম্প্রতি তাঁর ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তে’র একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ওই ভিডিওতে তাঁর সঙ্গে এক তরুণীকে দেখা যায়। ভিডিওটি আলোচনায় আসার পর গাজী নজরুল দাবি করেন, ওই তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী।

গাজী নজরুল তখন পাল্টা অভিযোগ করেছিলেন, গত ১৩ জুলাই তরুণীর বাবার অফিসে তাঁকে জি’\ম্মি করে এক লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন ওবায়দুর রহমান। ব্যক্তিগত ভিডিওটি ওবায়দুরই ফাঁস করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অন্যদিকে গত ২১ জুলাই রাজধানীর পল্লবী থানায় (Pallabi Police Station) গাজী নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে হ’\ত্যা’\চেষ্টার মামলা করেন ওবায়দুর রহমান। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, গাজী নজরুলের সঙ্গে তাঁর ভাগনির ‘অ’\নৈতিক সম্পর্কের’ প্রতিবাদ করা এবং ভিডিও ফাঁসের ঘটনায় তাঁকে সন্দেহ করার জেরে গত ১৪ জুলাই তাঁর ওপর হা’\মলা চালানো হয়।

‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে, বলেছিলেন মাসুম’

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই ওই তরুণীর রাজধানীর পল্লবীর ভাড়া বাসায় গাজী নজরুল ইসলামের নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলে দাবি করেন ওবায়দুর রহমান। তাঁর ভাষ্যমতে, সংসদ সদস্য হিসেবে এমপি হোস্টেলে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পাওয়ার পরও গাজী নজরুল ঢাকায় এলে ওই তরুণীর বাসাতেই থাকতেন।

ওবায়দুর জানান, ভাগনির সঙ্গে গাজী নজরুলের সম্পর্কের বিষয়টি জানতে পেরে তিনি তা পরিবারের সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু তরুণীর মা–বাবা শুরু থেকেই বিষয়টি গোপন রাখতে চাইছিলেন।

ওবায়দুরের ভাষায়, তাঁর বোনের স্বামী ও তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহ বলেছিলেন, ‘এমপিকে হাতে রাখতে হবে। পাঁচ বছরে আমাদের অনেক কিছু করে নিতে হবে।’

মাসুম বিল্লাহর বলা সেই ‘অনেক কিছু করে নেওয়া’র অর্থ কী ছিল, সে বিষয়েও বিস্তারিত দাবি করেন ওবায়দুর। তাঁর ভাষ্য, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই মাসুম বিল্লাহর নামে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি লাইসেন্স করিয়ে দেন গাজী নজরুল ইসলাম। ‘মাসুম এন্টারপ্রাইজ’ নামে ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়।

ওবায়দুরের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির হয়ে মাসুম বিল্লাহর কাজ ছিল শুধু বিভিন্ন কাজের দরপত্র জমা দেওয়া। দরপত্র জমা দেওয়ার পর সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই।

ওবায়দুর বলেন, ‘মাসুম কন্ট্রাক্টরির কিছুই বুঝত না। দায়িত্ব দেয় আমাকে। আমিও এসবের কিছু বুঝি না। তারপরও খেজুরের ব্যবসা বন্ধ করে টেন্ডারের বিষয়টি দেখাশোনা করছিলাম।’

তাঁর দাবি অনুযায়ী, মাসুম এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে সাতক্ষীরার দুটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে মোট পাঁচটি কাজের দরপ্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একটি দরপ্রস্তাব ছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (Local Government Engineering Department–LGED)। বাকি দরপ্রস্তাবগুলো ছিল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (Education Engineering Department) বিভিন্ন কাজের জন্য।

ওবায়দুর রহমান আরও দাবি করেন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি পদে তাঁদের অনুকূল একজন প্রকৌশলীকে বদলি করে আনার জন্য গাজী নজরুল ইসলাম নিজেই তদবির করেছিলেন। ওই প্রকৌশলীকে সেখানে বসানোর উদ্দেশ্য ছিল মাসুম এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দেওয়া।

এ বিষয়ে ওবায়দুর বলেন, ‘আমাদের কাজ দেওয়ার জন্য ওই প্রকৌশলীকে সেখানে বসানো হয়েছিল।’

তরুণীকে সংসদে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন ওবায়দুর। তাঁর ভাষ্য, সম্পর্কটি মেনে নেওয়া এবং গোপন রাখার বিনিময়ে একই পরিবারের বাবা ও মেয়েকে আলাদা আলাদা সুযোগের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।

ওবায়দুর বলেন, ‘মেয়েকে বলা হতো সংসদে চাকরি দেওয়া হবে। আর বাবাকে বলা হতো, বড় বড় কাজ দেওয়া হবে। এই লোভ দেখিয়েই পুরো বিষয়টি চলছিল।’

মুখ বন্ধ রাখতে গাড়ি ও পদ দেওয়ার প্রস্তাব

ওবায়দুর রহমানের দাবি, গত ২০ জুন তিনি এমপি হোস্টেলে গিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের কাছে ভাগনির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে সরাসরি জানতে চেয়েছিলেন। তখন গাজী নজরুল ‘মুতআ বিয়ে’র ফতোয়া তুলে ধরে সম্পর্কটিকে বৈধ বলে ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন। মুতআ বিয়ে বলতে অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিয়েকে বোঝানো হয়।

এরপর পুরো বিষয়টি জেনেও যেন ওবায়দুর মুখ বন্ধ রাখেন, সে জন্য গাজী নজরুলের পক্ষ থেকে তাঁকে একটি গাড়ি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।

ওবায়দুরের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়েছিল, সংসদ সদস্য ঢাকায় অবস্থান করলে তিনি ওই গাড়ি ব্যবহার করবেন। আর গাজী নজরুল ঢাকার বাইরে থাকলে গাড়িটি ওবায়দুর নিজের মতো করে ব্যবহার করে আয় করতে পারবেন। পাশাপাশি তাঁকে সংসদ সদস্যের এপিএস-২ বা সহকারী একান্ত সচিব হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ওবায়দুর বলেন, ‘আমি যখন সবকিছু জেনে যাই, তখনই আমাকে এসব প্রলোভন দেখানো হয়।’

ওবায়দুর রহমানের তোলা অভিযোগ ও বক্তব্যের বিষয়ে জানতে আজ গাজী নজরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করে প্রথম আলো। তবে তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর নতুন কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

নৈতিক স্খলনের কারণ দেখিয়ে জামায়াতে ইসলামী এরই মধ্যে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে। বহিষ্কারের পর থেকে তাঁকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তরুণীর বাবা মাসুম বিল্লাহর মুঠোফোনেও আজ কল করা হয়। তবে তাঁর ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে ঠিকাদারি লাইসেন্স, সরকারি কাজের প্রতিশ্রুতি এবং মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে ওবায়দুরের তোলা অভিযোগের বিষয়ে মাসুম বিল্লাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে ব্যক্তিগত ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী এবং ভিডিওতে থাকা তরুণী আলাদা ভিডিও বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যে তরুণী অভিযোগ করেন, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

তরুণীর দাবি, ২০২৬ সালের ১৭ জুন উভয় পরিবারের সম্মতিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে তাঁর বাবার বাড়িতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি।

তরুণী আরও দাবি করেন, গত ১৩ জুলাই ঢাকার মগবাজারে তাঁর বাবার অফিসে যাওয়ার পর পরিকল্পিতভাবে একটি ‘অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি’ তৈরি করা হয়। পরে তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।