বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে মামলা করতে থানায় গিয়েছিলেন সোনিয়া আক্তার কেয়া। কিন্তু শেষ পর্যন্ত উল্টো পুলিশের করা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে। ওই নারীর অভিযোগ, মামলা নিতে ঘুষ দাবি ও অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় থানার ভেতরে তাকে রাতভর মা’\রধর করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধেই সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং পুলিশ সদস্যকে মা’\রধরের অভিযোগ এনে মামলা করা হয়। আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানোর পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দুই দিন কারা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। রাজধানীর রামপুরা থানা পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিভিন্ন দিক যুগান্তরের অনুসন্ধানেও উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পূর্ব রামপুরার ২৪৮/৬/১ নম্বর ‘মমতাজ ভিলা’র ভাড়াটিয়া সোনিয়া আক্তার কেয়া (Sonia Akter Keya) গত ২৭ মে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে দোহারে গ্রামের বাড়িতে যান। অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাসার চাবি বাড়িওয়ালার কাছে রেখে যেতে হয়েছিল তাকে। কয়েক দিন পর ঢাকায় ফিরে তিনি দেখতে পান, আলমারিতে রাখা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও চেকবই খোয়া গেছে।
এ ঘটনা নিয়ে বাড়িওয়ালা আলমগীরের সঙ্গে তার বিরোধ শুরু হয়। পরে ৫ জুন তিনি রামপুরা থানা (Rampura Police Station)-এ অভিযোগ দিতে যান। কিন্তু থানা পুলিশ তার অভিযোগ নিতে অস্বীকৃতি জানায় বলে দাবি করেছেন তিনি। পরদিন খিলগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার তৌফিক আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সোনিয়া। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসি তৌফিক তখন তাকে বলেন, ‘ওসিকে বলে দিচ্ছি। মামলা নেবে।’
এরপর রামপুরা থানা পুলিশ তার লিখিত অভিযোগ গ্রহণ করলেও সেটি তখন মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হয়নি বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।
দুই লাখ টাকা দাবি, এরপর অনৈতিক প্রস্তাবের অভিযোগ
সোনিয়ার অভিযোগ, ৮ জুন রাতে তিনি আবার থানায় গিয়ে তার অভিযোগটি মামলা হিসেবে নেওয়ার অনুরোধ করেন। এ সময় রামপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন তার কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওসি তার শরীর নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেন বলে অভিযোগ করেন সোনিয়া।
তিনি দাবি করেন, ওই প্রস্তাবের প্রতিবাদ করলে প্রথমে ওসি তার বুকে আ’\ঘাত করেন। এরপর কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে মা’\রধর করেন। পরিস্থিতি বুঝে তিনি দ্রুত থানা থেকে বের হয়ে সহকারী পুলিশ কমিশনার তৌফিক আহমেদকে ফোন করেন এবং ঘটনাটি জানিয়ে তাকে থানায় আসার অনুরোধ করেন।
এরপর সোনিয়া পুরো ঘটনা ফেসবুক লাইভে প্রচারের চেষ্টা করলে পুলিশ তার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলে বলে অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে ওসি থানা থেকে গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে সোনিয়া গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার পথ আটকান।
অনুসন্ধানে পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রাত সোয়া ১০টার দিকে ওসির গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সোনিয়াকে এক পুলিশ সদস্য বলছেন, ‘আপনি ভেতরে যান, আপনার মামলা নেওয়া হবে।’
তবে ওসি জাহাঙ্গীর হোসেনের দাবি, এর আগেই সোনিয়ার অভিযোগ এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। সোনিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের করা মামলার নথিতেও একই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। ওই এজাহারে বলা হয়, সোনিয়ার দেওয়া অভিযোগ আগেই মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। তারপরও তিনি থানায় খারাপ আচরণ করেন এবং পুলিশ সদস্যদের মা’\রধর করেন।
কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া ভিডিওচিত্রে পুলিশের ওই বক্তব্যের সঙ্গে অসংগতি দেখা যায়। কারণ সেখানে একজন পুলিশ সদস্যকে তখনও সোনিয়াকে ভেতরে গিয়ে মামলা রেকর্ড করার আশ্বাস দিতে শোনা যায়।
হেল্প ডেস্ক থেকে খিলগাঁও থানা—রাতভর মা’\রধরের অভিযোগ
সোনিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, ওসির গাড়ির সামনে থেকে তাকে রামপুরা থানার মহিলা হেল্প ডেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কয়েকজন পুলিশ সদস্য প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তাকে মা’\রধর করেন।
রাত ১২টার পর সহকারী পুলিশ কমিশনার তৌফিক আহমেদ থানায় পৌঁছালে তার সামনে পুরো ঘটনা তুলে ধরেন সোনিয়া। এরপর তিনি বাসায় ফিরে যেতে চান। কিন্তু এসি তাকে জানান, ওসি থানায় আসার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।
পরে ওসি থানায় ফিরে এলে আবারও সোনিয়াকে মা’\রধর করতে করতে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, গাড়িতে তোলার পর ওড়না দিয়ে চোখ বেঁধে তাকে খিলগাঁও থানা (Khilgaon Police Station)-এ নেওয়া হয়। রামপুরা থেকে খিলগাঁও থানায় নেওয়ার পুরো পথেও তাকে মা’\রধর করা হয়।
এরপর সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং পুলিশ সদস্যকে মা’\রধরের অভিযোগে খিলগাঁও থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
পরদিন সকালে সোনিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে খিলগাঁও থানা পুলিশ তাকে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (Mugda Medical College Hospital)-এ নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর দুপুরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
সোনিয়ার অভিযোগ, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আ’\ঘাতের চিহ্ন এবং ছেঁড়া কাপড় থাকা সত্ত্বেও তাকে বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি। আদালতের হাজতখানায় রেখে শুধু মামলার নথি বিচারকের কাছে উপস্থাপন করা হয়।
পরে আদালতের নির্দেশে সন্ধ্যায় তাকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার (Kashimpur Women’s Central Jail)-এ পাঠানো হয়। কারা কর্তৃপক্ষ তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে দুই দিন কারা হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেয়। সাত দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পান সোনিয়া।
পুলিশ সদস্যের চিকিৎসার নথি মেলেনি
সোনিয়ার বিরুদ্ধে করা পুলিশের মামলায় বলা হয়েছে, তিনি রামপুরা থানার নারী কনস্টেবল আরিফা সুলতানাকে মা’\রধর করেন। এ কারণে আরিফা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৮ ও ৯ জুন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে আরিফা সুলতানা নামে কারও চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য নেই। তবে একই হাসপাতালের রেকর্ড বইয়ে সোনিয়ার চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পুলিশের কাছে সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে এবং সেখানে একজন নারী পুলিশ সদস্যকে ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা দেখা যায়। তবে সেই ফুটেজ দেখতে চাওয়া হলে তিনি তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।
৯ জুন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছিলেন চিকিৎসক ডা. আয়েশা আমিন। বর্তমানে তিনি বদলি হয়ে জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে কর্মরত। সোনিয়ার চিকিৎসাপত্র দেখিয়ে জানতে চাইলে ডা. আয়েশা আমিন যুগান্তরকে বলেন, সোনিয়া আক্তার কেয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আ’\ঘাতের চিহ্ন ছিল। সে অনুযায়ী তাকে ওষুধ দেওয়া হয়েছিল এবং হাসপাতালের নথিতেও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
গ্রে’\ফতারের খবর পরিবারকে না জানানোর অভিযোগ
সোনিয়ার পরিবারের সদস্যদের দাবি, তার বিরুদ্ধে মামলা এবং তাকে গ্রে’\ফতারের বিষয়টি পরিবারকে জানানো হয়নি। অথচ বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে গ্রে’\ফতার করার পর ১২ ঘণ্টার মধ্যে তার পরিবার বা আইনজীবীকে বিষয়টি জানানো বাধ্যতামূলক।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা তাকে গ্রে’\ফতার করিনি। রামপুরা থানা পুলিশ তাকে আমাদের থানায় দিয়ে মামলা করিয়েছে। এছাড়া তিনি আমাদের কাছে কোনো সহায়তা চাননি।’
আদালতে বিচারকের সামনে সোনিয়াকে হাজির না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিচারক আসামিকে দেখবেন কি না, সেটি আদালতের এখতিয়ার।
পুলিশ সদস্যদের ওপর হা’\মলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআই সালাহ উদ্দিন বলেন, অভিযোগ রয়েছে সোনিয়া দুই থেকে তিনজন পুলিশ সদস্যকে মা’\রধর করেছেন। তবে তদন্তের সব নথি তখনও তার হাতে পৌঁছায়নি।
থানার বাইরে দাঁড়িয়ে মায়ের চিৎকার শুনেছিলেন ছেলে
জানা যায়, সোনিয়া একজন ডিভোর্সি নারী। কলেজপড়ুয়া ছেলে মো. ইয়াসিনকে নিয়ে তিনি ঢাকায় বসবাস করেন। তার গ্রামের বাড়ি দোহারে। পেশায় তিনি একজন অভিনয়শিল্পী।
থানায় মা’\রধরের অভিযোগের ওই রাতে সোনিয়ার ছেলে, মা এবং পরিচিত অনেকেই রামপুরা থানায় গিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাদের কাউকেই সোনিয়ার সঙ্গে দেখা করতে দেয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।
সোনিয়ার ছেলে মো. ইয়াসিন বলেন, মায়ের ফেসবুক লাইভ দেখে তিনি, তার নানি ও এক বন্ধু থানায় যান। কিন্তু পুলিশ তাদের থানার ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। বাইরে দাঁড়িয়ে তারা সোনিয়ার চিৎকার শুনতে পান।
ইয়াসিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পরে তারা দেখেন পুলিশ তার মাকে মা’\রধর করতে করতে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তখন পরিবারের সদস্যদের বলা হয়েছিল, সোনিয়াকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
খিলগাঁও জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার তৌফিক আহমেদ বলেন, সোনিয়া তাকে ফোন করে থানায় আসার অনুরোধ করেছিলেন। যানজট পেরিয়ে তিনি রাত ১২টার পর থানায় পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে এবং ওসি ওই নারীর বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
একই রাতে বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে মামলা
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সোনিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা হওয়ার রাতেই বাড়িওয়ালা আলমগীরের বিরুদ্ধে তার দেওয়া অভিযোগটি এফআইআর হিসেবে রেকর্ড করা হয়।
তবে সোনিয়ার অভিযোগ, তাকে না জানিয়েই ওই মামলা রেকর্ড করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মামলার তারিখ পরিবর্তনসহ আরও কয়েকটি অনিয়ম করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে বাড়িওয়ালা আলমগীর সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। যুগান্তরকে তিনি বলেন, সোনিয়ার বাসা থেকে কোনো কিছু চু’\রি হয়নি এবং তার সঙ্গে কোনো ধরনের খারাপ আচরণও করা হয়নি।
সোনিয়াকে মা’\রধরের অভিযোগও অস্বীকার করেছেন রামপুরা থানার ওসি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি বলেন, ওই নারীকে মা’\রধর করা হয়নি। বরং তিনি থানায় এসে খারাপ ব্যবহার করেছেন, একজন নারী পুলিশ সদস্যকে মা’\রধর করেছেন এবং সেবা নিতে আসা আরও অনেকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police—DMP)-এর মতিঝিল বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ বলেন, ওই নারীর অভিযোগ কতটা সত্য, তা নিয়ে তাদের সন্দেহ রয়েছে। তারপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ
পুরো ঘটনা নিয়ে সোনিয়া আক্তার কেয়া পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। ডিএমপি কমিশনার বিষয়টি তদন্ত করবেন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ওসমান গণিও বলেন, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
