কৃষকের কাছ থেকে উৎপাদিত পণ্য ভোক্তার টেবিলে পৌঁছানোর পথে একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার, পাইকার, আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফা এবং পরিবহন ব্যবস্থায় চাঁদাবাজির কারণে দেশের অন্তত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কৃষক পর্যায়ের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (Centre for Policy Dialogue-CPD)।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে নিত্যপণ্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে সিপিডির গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। এতে অংশ নেন খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির (Khandaker Abdul Muqtadir), অর্থনীতিবিদ এবং ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সিপিডির গবেষণায় দেশের ৮১০টি বাজার পরিদর্শন করে ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিভিন্ন ধাপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সব পণ্যের ক্ষেত্রে একই পর্যায়ে মূল্য বৃদ্ধি হয় না। বরং পণ্যের ধরন অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন স্তরে সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, কৃষক বা ফার্ম থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে মসুর ডালের দাম বেড়ে যায় ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজের ৮৭ শতাংশ, আলুর ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচের ১১৬ শতাংশ, বেগুনের ৭২ শতাংশ, ডিমের ২৫ শতাংশ, গরুর মাংসের ১৩ শতাংশ, মাছের ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির ২২ শতাংশ।
চালের ক্ষেত্রে উৎপাদক থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছাতে পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় চালের গড় দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মিলার পর্যায়েই প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ১৮ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়, যা পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সর্বোচ্চ।
ডালের বাজারে সবচেয়ে বেশি মূল্য বাড়ান শহরের আড়তদাররা। একই প্রবণতা দেখা গেছে কাঁচা মরিচের ক্ষেত্রেও, যেখানে শহরের আড়তদাররা গড়ে প্রতি কেজিতে প্রায় ১০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বাড়িয়ে দেন।
অন্যদিকে বেগুন ও আলুর বাজারে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেন খুচরা বিক্রেতারা। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে প্রান্তিক পাইকারদের পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য মূল্য বৃদ্ধি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে এসে দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়।
আমিষজাতীয় পণ্যের বাজারেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, মাছের দামের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি ঘটে শহরের আড়তদার পর্যায়ে। ডিম ও ব্রয়লার মুরগির বাজারে পাইকারদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আর গরুর মাংসের ক্ষেত্রে ব্যাপারিদের মাধ্যমে প্রতি কেজিতে গড়ে প্রায় ৭৫ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পায়।
সংলাপে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ফারুক আল কবীর গবেষণার বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন। পরে অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন (Dr. Fahmida Khatun) বলেন, বাজারে স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর ফলে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না, আবার ভোক্তাদেরও বেশি দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে।
গবেষণার পর্যবেক্ষণের জবাবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশে কৃষিপণ্যের উৎপাদন পরিকল্পনায় এখনো তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। ফলে কোনো বছর কোনো পণ্যের ঘাটতি তৈরি হয়, আবার কোনো বছর অতিরিক্ত উৎপাদন হয়। এতে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
তিনি বলেন, দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে গড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হয়, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ। এই ব্যয় কমানো গেলে খাদ্যপণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এছাড়া উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থার বিভিন্ন অসঙ্গতিও মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী। বাজারের অনানুষ্ঠানিক ব্যয় কমানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বাণিজ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজি একটি বাস্তব সমস্যা। এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি কমাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সংলাপে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (Consumers Association of Bangladesh-CAB)-এর সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, কৃষিপণ্য পরিবহনের পথে চাঁদাবাজির কারণে অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এই অদৃশ্য ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।


