বাবার নি’\র্যাতন থেকে ৫০০ টাকা হাতে মুম্বাই যাত্রা, শৈশবের কষ্টের কথা জানালেন রবি কিষাণ

পর্দায় হাসিখুশি উপস্থিতি আর অভিনয় দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছেন ভোজপুরি ও বলিউড তারকা, পাশাপাশি সংসদ সদস্য রবি কিষাণ (Ravi Kishan)। তবে তার পরিচিত এই সাফল্যের আড়ালে শৈশবের গল্প ছিল চরম মানসিক ও শারীরিক নি’\র্যাতনে ভরা। সম্প্রতি ভারতের জনপ্রিয় পডকাস্টার রাজ শামানি (Raj Shamani)-র সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের ছোটবেলার নানা অজানা ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা খোলামেলাভাবে তুলে ধরেছেন এই অভিনেতা।

বাবার হাতে নিত্যদিনের নি’\র্যাতন

রবি কিষাণের বাবা ছিলেন একজন পুরোহিত। বাবার অত্যন্ত কঠোর অনুশাসনের মধ্যেই তার বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই বাবার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল থাকতেন রবি। কিন্তু সেই সম্পর্কের মধ্যে স্নেহের প্রকাশের চেয়ে কঠোরতাই ছিল বেশি।

রবি জানান, ছোটবেলায় ঈশ্বরের প্রতি বাবার অন্ধ ভক্তি নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলতেন। একই সঙ্গে রামলীলায় দেবী সীতার চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। এসব বিষয় তার বাবা সহজভাবে নিতে পারেননি। রবির ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কারণে বাবা তাকে প্রায় প্রতিদিনই মা’\রধর করতেন।

তবে শৈশবের সেই নি’\র্মমতাকেও একসময় অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করতেন রবি। তিনি বলেন, তার বাবা কখনো মুখে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারতেন না। বাবা-ছেলে কখনো একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেননি। ফলে বাবা যখন তাকে মা’\রতেন, তখন ছোট্ট রবি ভাবতেন, হয়তো এটিই তার সঙ্গে বাবার যোগাযোগের কিংবা ভালোবাসা প্রকাশের নিজস্ব উপায়।

৫০০ টাকা হাতে বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত

রবি কিষাণের বাবার ইচ্ছা ছিল, ছেলে চাষাবাদ করুক, দুধ বিক্রি করুক কিংবা কোনো সরকারি চাকরিতে যোগ দিক। কিন্তু অভিনয় কিংবা নাচকে তিনি কোনোভাবেই গ্রহণ করতে পারতেন না। অথচ রবির স্বপ্ন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই দ্বন্দ্বই একসময় বাবা-ছেলের সম্পর্ককে আরও কঠিন করে তোলে।

একদিন পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যখন নি’\র্যাতনের মাত্রা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। সেই দিনের কথা স্মরণ করে রবি জানান, বাবা তাকে এমনভাবে মা’\রধর করেছিলেন যে তার মনে হচ্ছিল শরীরের চামড়া উঠে যাবে।

সেদিন শেষ পর্যন্ত তার মা-ই তাকে বাবার হাত থেকে রক্ষা করেন। রবি কিষাণের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, মা তাকে ৫০০ টাকা হাতে দিয়ে দ্রুত বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। তার মা আশঙ্কা করেছিলেন, সেখানে থাকলে বাবা সেদিন তাকে মে’\রেই ফেলতে পারেন।

মায়ের দেওয়া সেই ৫০০ টাকাই ছিল রবির সম্বল। সেই সামান্য অর্থ হাতে নিয়েই বাড়ি ছেড়ে তারকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাই (Mumbai)-এর পথে পাড়ি জমান তিনি।

মুম্বাইয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম

মুম্বাইয়ে পৌঁছানোর পর রবির পথ মোটেও সহজ ছিল না। শুরুর দিনগুলো তাকে ভীষণ কষ্টের মধ্য দিয়ে কাটাতে হয়েছে। ঠিকমতো খাবার ছিল না, ভালো পোশাকও ছিল না। কিন্তু অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজের স্বপ্নের ওপর বিশ্বাস হারাননি তিনি।

নিজের জায়গা তৈরি করতে দীর্ঘ সময় সংগ্রাম করতে হয়েছে রবি কিষাণকে। সেই লড়াই চলেছে বছরের পর বছর। ৩৩ বছরের দীর্ঘ সংগ্রামের পর একসময় তার জীবনে আসতে শুরু করে সাফল্য। ধীরে ধীরে একের পর এক কাজের মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠিত তারকা হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।

যে ছেলের অভিনয় ও নাচকে একসময় বাবা মেনে নিতে পারেননি, সেই ছেলেই পরবর্তী সময়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন ভোজপুরি ও বলিউড অঙ্গনে।

শেষ বয়সে ছেলের কাছে বাবার ক্ষমা প্রার্থনা

জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর শৈশবের কষ্ট মনে রেখে বাবার কাছ থেকে দূরে সরে যাননি রবি কিষাণ। বরং বাবার জন্য সব ধরনের আরাম-আয়েশ এবং বিলাসী জীবনের ব্যবস্থা করেন তিনি।

একসময় সেই বাবাই নিজের ভুল বুঝতে পারেন। রবি জানান, একদিন তার বাবা কেঁদে ফেলেছিলেন। ছেলের কাছে হাত জোড় করে নিজের অতীত আচরণের জন্য ক্ষমাও চান তিনি।

বাবা রবিকে বলেন, তাকে যেন ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কারণ নিজের ছেলেকে চিনতে তিনি ভুল করেছিলেন।

রবি কিষাণও বাবার প্রতি কোনো ক্ষোভ ধরে রাখেননি। বাবাকে ক্ষমা করে তিনি বলেন, তার বাবা-ই তার কাছে ঈশ্বরের মতো। বাবার শেখানো সেই কঠোর অনুশাসনই তাকে জীবনের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন তিনি।

শৈশবের গভীর ট্রমা ও ক্ষত নিয়ে বেড়ে উঠলেও জীবনের শেষ সময়ে বাবার সঙ্গে একটি মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন রবি কিষাণ। ছোটবেলার নি’\র্যাতন, বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া, মুম্বাইয়ের দীর্ঘ সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত বাবার সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন—নিজের জীবনের সেই কঠিন অধ্যায়গুলোই এবার সাক্ষাৎকারে সামনে এনেছেন জনপ্রিয় এই তারকা।