ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মা ও ছেলে—দুজনই জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন। রাজশাহী মহানগরী (Rajshahi Metropolitan)-র রাজপাড়া থানা এলাকার সাদিয়া বেগম (Sadia Begum) এবং তার ছেলে তানভীর আহমেদ (Tanvir Ahmed)-এর এই ব্যতিক্রমী সাফল্যে আনন্দিত পরিবার ও এলাকার মানুষ।
জানা গেছে, প্রায় ১৯ বছর আগে বিয়ে হয় সাদিয়া বেগমের। বিয়ের পর সংসার ও পারিবারিক দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে পড়াশোনা থেকে দীর্ঘ সময় দূরে থাকতে হয় তাকে। তবে সময়ের সঙ্গে পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ হারিয়ে যায়নি। বরং সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। পরে আবারও বই হাতে তুলে নেন এবং সংসার ও দুই সন্তানের দেখাশোনার পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশোনা শুরু করেন।
প্রায় দুই বছর আগে সাদিয়া সিদ্ধান্ত নেন, ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবেন। তার এই সিদ্ধান্তে পরিবারের সদস্যরাও সম্মতি দেন। এরপর শুরু হয় নতুন করে প্রস্তুতি। দীর্ঘ বিরতির পর আবার পাঠ্যবই, পরীক্ষা ও নিয়মিত পড়াশোনার জীবনে ফিরে আসেন তিনি।
চলতি বছরের এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় রাজপাড়া আদর্শ মহিলা টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজ (Rajpara Adarsha Mohila Technical and BM College) থেকে পরীক্ষায় অংশ নেন সাদিয়া বেগম। শেষ পর্যন্ত তার পরিশ্রমের ফলও আসে প্রত্যাশিতভাবে। পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন তিনি।
একই বছরে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল তার ছেলে তানভীর আহমেদও। তবে তার পরীক্ষার ক্ষেত্র ছিল ভিন্ন। তানভীর রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (Rajshahi Education Board Government Model School and College)-এর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। ফলাফলে সে অর্জন করে গোল্ডেন জিপিএ-৫।
মা ও ছেলে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনেরই সর্বোচ্চ ফল অর্জনের ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই পরিবার ও পরিচিতজনদের মধ্যে আলাদা আনন্দ তৈরি করেছে। সাদিয়ার কাছে এই সাফল্য দীর্ঘদিনের অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণের ফল, আর তানভীরের কাছে মায়ের সঙ্গে একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়াটাই বিশেষ এক অভিজ্ঞতা।
সাদিয়া বেগম বলেন, পড়াশোনার প্রতি তার সবসময়ই ঝোঁক ছিল। কিন্তু বিয়ের পর নানা বাস্তবতায় আর পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারেননি। তারপরও তিনি হাল ছাড়েননি। প্রায় দুই বছর আগে ছেলের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর সেই লক্ষ্যেই প্রস্তুতি শুরু করেন।
ছেলে তানভীরও মায়ের সঙ্গে একই সময়ে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতাকে নিজের জীবনের সৌভাগ্যের একটি ঘটনা হিসেবে দেখছে।
তানভীরের ভাষ্য, “মায়ের সঙ্গে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে দুজনই জিপিএ-৫ পেয়েছি। মায়ের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার সৌভাগ্য কয়জনের হয়।”
তানভীর জানায়, তার মা শুধু নিজের পড়াশোনাই করেননি, একই সঙ্গে নিয়মিত তার পড়াশোনারও খোঁজ রাখতেন। অনেক সময় রাত জেগে ছেলের পাশে বসে থাকতেন সাদিয়া। একদিকে নিজের পরীক্ষার প্রস্তুতি, অন্যদিকে সন্তানের পড়াশোনার দেখভাল—দুই দায়িত্বই একসঙ্গে সামলেছেন তিনি।
নিজের এই সাফল্য বাবা-মাকে উৎসর্গ করেছে তানভীর। ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্নের কথাও জানিয়েছে সে। তার লক্ষ্য, পড়াশোনা চালিয়ে গিয়ে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।
মা-ছেলের এমন ফলাফলে আনন্দিত তাদের গৃহশিক্ষক আরিফুল ইসলাম (Ariful Islam)-ও। প্রায় চার বছর ধরে তিনি তানভীরকে ইংরেজি পড়িয়ে আসছেন। একই সঙ্গে সাদিয়া যখন নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন, তখন তাকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেছেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সাদিয়া বেগমের স্বামী তোফাজ্জল হোসেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। সংসার, স্বামী ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দীর্ঘ বিরতির পর আবার পড়াশোনায় ফিরে আসা সাদিয়ার জন্য সহজ ছিল না। তারপরও নিজের ইচ্ছাকে থামিয়ে রাখেননি তিনি।
দীর্ঘ ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবন, সংসারের দায়িত্ব, দুই সন্তানের দেখাশোনা—সবকিছুর মধ্যেই নিজের পড়াশোনার স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন সাদিয়া। শেষ পর্যন্ত ছেলের সঙ্গে একই বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জনের মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় এক সাফল্য পেলেন তিনি।
অন্যদিকে একই পরীক্ষার বছরে ছেলে তানভীরের গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন মা-ছেলের আনন্দকে করেছে আরও বিশেষ। একই পরিবারের মা ও ছেলে একসঙ্গে পরীক্ষার্থী হয়ে দুজনেরই জিপিএ-৫ পাওয়া তাদের অধ্যবসায়, পারিবারিক সহযোগিতা ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহেরই এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।


