রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল, বিএনপিতে এখন আলোচনায় মহাসচিবের উত্তরসূরি ও ঠাকুরগাঁও-১ আসন

প্রত্যাশিতভাবেই রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সভা শেষে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। ইতোমধ্যে দলের মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রাথমিক সদস্যসহ দলীয় সব পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন মির্জা ফখরুল। মন্ত্রিসভা থেকেও তিনি পদত্যাগ করবেন।

সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়া অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি রাষ্ট্রপতি হলে একই সঙ্গে দল ও সরকারের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য হয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে বিএনপির মহাসচিবের পদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর পদ এবং ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসন।

বিএনপি ও সরকারের সূত্র বলছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে সংসদ সচিবালয় তার ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি শূন্য ঘোষণা করবে। এরপর সেখানে উপনির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

মহাসচিবের উত্তরসূরি কে?

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক পদ মহাসচিবের দায়িত্ব কে নেবেন, এখন সামনে এসেছে সেই প্রশ্ন। গত কয়েক দিন ধরে দলের ভেতরে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে তিনজন নেতার নাম বেশি আলোচনায় রয়েছে।

তাদের মধ্যে দুজন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য—স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অন্যজন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

বিএনপির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে অথবা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটি প্রাথমিকভাবে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিলে বা তার আশপাশের সময়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

রুহুল কবির রিজভী এবারের নির্বাচনে অংশ নেননি এবং তাকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। ফলে মহাসচিবের পদ শূন্য হলে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন দলের দায়িত্বশীল নেতাদের অনেকে।

বিএনপির আগের রেওয়াজও এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে যায়। মির্জা ফখরুল নিজেও একসময় দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। পরে তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি ভারমুক্ত হয়ে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিবের দায়িত্ব পান।

তবে বিএনপির একটি অংশ চায়, স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যকেই সরাসরি মহাসচিব করা হোক। সে ক্ষেত্রে সালাহউদ্দিন আহমদ ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। তবে দুজনই তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাদের কাউকে মহাসচিব করা হবে কি না, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।

মির্জা ফখরুলের মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মির্জা ফখরুল পদত্যাগ করলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নতুন কাউকে দেওয়া হবে, নাকি বর্তমান মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেটিও এখনো পরিষ্কার নয়।

আজ বিকাল চারটার মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারিত রয়েছে। এরপর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। ১৮ আগস্ট মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। প্রত্যাহারের পর একাধিক প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট সংসদের সভাকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর সদস্যসংখ্যা সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ ৯০। ফলে ভোট হলে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীর জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। সেই হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন—এটি এখন প্রায় পরিষ্কার।

রাষ্ট্রপতি পদে শূন্যতা ও সাংবিধানিক বিধান

গত ২৪ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ) মনোনয়নে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে।

সংবিধানের ৫০ (১) ধারায় রাষ্ট্রপতির মেয়াদ সম্পর্কে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি কার্যভার গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদে পদে থাকবেন। তবে উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে বহাল থাকবেন। একই সঙ্গে কেউ দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র দিয়ে পদ ছাড়তে পারেন।

সংবিধানে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি তার কার্যভারকালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি পদে থেকে সংসদ সদস্য থাকা যাবে না। কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণের দিনেই তার সংসদীয় আসন শূন্য হয়ে যাবে।

মন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রপতি হলে কী হবে?

কোনো মন্ত্রী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হলেই শুধু নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মন্ত্রিত্ব শেষ হয়ে যায়—এমন সরাসরি বিধান নেই। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি আর মন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকতে পারবেন না।

সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর পদকে সরকারের মন্ত্রিসভার কাঠামোর অংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে ৪৮(২) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অতীতেও আবদুর রহমান বিশ্বাস, আবদুল হামিদসহ অন্য নেতারা স্পিকার বা মন্ত্রিসভার দায়িত্ব থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে তারা তাদের আগের পদ ছেড়েছিলেন।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে তার ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে। ফলে এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে, এই আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য কে হতে যাচ্ছেন।

মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে নির্বাচন কমিশন সেখানে শিগগিরই উপনির্বাচনের আয়োজন করবে। আর সেই নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিবারের সদস্যসহ স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম আলোচনায় এসেছে।

মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে ড. শামারুহ মির্জা বাবার আসনে নির্বাচন করতে পারেন বলে জানা যাচ্ছে। গত নির্বাচনে তিনি বাবার পক্ষে ভোটের মাঠে কাজ করেছিলেন। পেশায় তিনি একজন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক। দীর্ঘদিন ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন এবং সেখানে সমাজসেবামূলক কাজের জন্য তার পরিচিতি রয়েছে।

এ ছাড়া আলোচনায় রয়েছেন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন। এর আগে তিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়রের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয় রাজনীতিতেও তিনি বেশ সক্রিয়। তিনি মির্জা ফখরুলের ভাই।

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন শুধু দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সমীকরণই স্পষ্ট করছে না, বিএনপির ভেতরেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। মহাসচিবের উত্তরসূরি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী—এই তিনটি বিষয়েই এখন দলের ভেতরে আলোচনা আরও জোরালো হওয়ার অপেক্ষা।