বিদেশি ‘বিগ ব্রাদার’ থেকে ভারতের ‘বিগ বস’, নামের নেপথ্যে ছিল যে হিসাব

রিয়্যালিটি শোর দুনিয়ায় বিগ বস (Bigg Boss) এখন ভারতের সবচেয়ে পরিচিত অনুষ্ঠানগুলোর একটি। প্রতিযোগীদের ঝগড়া-বিবাদ, প্রেম, বন্ধুত্ব, নানা ধরনের টাস্ক আর একের পর এক বিতর্ক—সব মিলিয়ে বছরের পর বছর দর্শকদের আগ্রহ ধরে রেখেছে এই শো। এর সঙ্গে সঞ্চালক হিসেবে সালমান খান (Salman Khan)-এর উপস্থিতি অনুষ্ঠানটির জনপ্রিয়তাকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। কিন্তু বিদেশি ‘বিগ ব্রাদার’-এর আদলে তৈরি হলেও ভারতীয় সংস্করণটির নাম কেন ‘বিগ বস’ রাখা হয়েছিল, সেই গল্পটি অনেকেরই অজানা।

‘বিগ বস’-এর মূল ফরম্যাট নেওয়া হয়েছে নেদারল্যান্ডসের জনপ্রিয় রিয়্যালিটি শো বিগ ব্রাদার (Big Brother) থেকে। এই ফরম্যাটে একদল প্রতিযোগীকে বাইরের জগত থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন একটি বাড়িতে রাখা হয়। বাড়ির ভেতরে তাদের প্রায় প্রতিটি কর্মকাণ্ড সারাক্ষণ ক্যামেরায় ধারণ করা হয়। প্রতিযোগীদের নিয়মিত বিভিন্ন টাস্কে অংশ নিতে হয়, পাশাপাশি থাকে মনোনয়ন এবং দর্শকদের ভোটে শো থেকে বাদ পড়ার প্রক্রিয়া। একের পর এক ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত যিনি টিকে থাকেন, তিনিই বিজয়ী হন।

ভারতে এই আন্তর্জাতিক ফরম্যাট নিয়ে কাজ শুরু হওয়ার পর নির্মাতাদের সামনে বড় একটি প্রশ্ন ছিল—অনুষ্ঠানটির নাম কী হবে? ‘বিগ ব্রাদার’ নামটি সরাসরি ব্যবহার না করে এমন একটি নাম খোঁজা হচ্ছিল, যা ভারতীয় দর্শকদের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হবে। একই সঙ্গে নামটিকে অনুষ্ঠানের চরিত্র, নিয়ন্ত্রণের আবহ এবং সামগ্রিক ব্র্যান্ড ভাবনার সঙ্গেও মানানসই হতে হতো।

এই ভারতীয় সংস্করণ তৈরির প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এন্ডেমেল শিন্ডে ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা দীপক ধর (Deepak Dhar)। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নাম নির্বাচনের সময় শুধু শুনতে ভালো লাগছে কি না, সেটাই বিবেচনায় ছিল না। ভারতীয় দর্শকদের কাছে নামটির গ্রহণযোগ্যতা কেমন হবে, উচ্চারণ কতটা সহজ হবে এবং অনুষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সেটি কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এমন একাধিক বিষয় নিয়ে ভাবা হয়েছিল। সবদিক বিবেচনার পর শেষ পর্যন্ত ‘বিগ বস’ নামটিই চূড়ান্ত করা হয়।

তবে নামটি বেছে নেওয়ার পেছনে কেবল সৃজনশীল চিন্তা বা ব্র্যান্ডিংয়ের সাধারণ হিসাবই ছিল না। দীপক ধর জানিয়েছেন, নাম নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংখ্যাতত্ত্বকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। শব্দের অর্থ এবং উচ্চারণের পাশাপাশি নামের অক্ষরগুলোর সংখ্যাগত মূল্যও যাচাই করা হয়। অর্থাৎ ‘বিগ ব্রাদার’ থেকে ‘বিগ বস’-এ নাম বদলে যাওয়ার বিষয়টি আকস্মিক ছিল না; বরং এটি ছিল পরিকল্পিত ব্র্যান্ডিং প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।

আজ ‘বিগ বস’ নামটি উচ্চারণ করলেই অনেক দর্শকের চোখের সামনে প্রথমে সালমান খানের মুখ ভেসে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে অনুষ্ঠানটির সঞ্চালক হিসেবে তিনি এতটাই পরিচিত হয়ে উঠেছেন যে শো এবং তার নাম যেন অনেকটাই একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। অথচ শুরু থেকেই ‘বিগ বস’-এর সঞ্চালকের আসনে সালমান ছিলেন না।

হিন্দি সংস্করণের প্রথম সিজন শুরু হয় ২০০৬ সালে। সে সময় অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন আরশাদ ওয়ারসি (Arshad Warsi)। এরপর দ্বিতীয় সিজনে সঞ্চালকের দায়িত্ব নেন শিল্পা শেঠি (Shilpa Shetty)। তৃতীয় সিজনে সেই দায়িত্ব যায় অমিতাভ বচ্চনের হাতে।

এরপর চতুর্থ সিজন থেকে ‘বিগ বস’-এর সঞ্চালকের দায়িত্বে আসেন সালমান খান। দীর্ঘদিন ধরে তার উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটির পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা আরও বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিযোগীদের সঙ্গে তার কথোপকথন, বিভিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়া এবং সঞ্চালনার নিজস্ব ধরনও সময়ের সঙ্গে শোটির পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।

একটি বিদেশি রিয়্যালিটি শোর ফরম্যাট অনুসরণ করে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে ‘বিগ বস’ ভারতীয় দর্শকদের কাছে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছে। নাম নির্বাচন থেকে শুরু করে সঞ্চালক পরিবর্তন—বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে বর্তমানে এটি আর কেবল একটি রিয়্যালিটি অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নেই। ভারতীয় টেলিভিশন বিনোদনের অন্যতম পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে ‘বিগ বস’।