আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে আবারও বাংলাদেশের সিনেমার উপস্থিতি। কলকাতায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পঞ্চম ওয়ার্ল্ড ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের তিনটি সিনেমা। এগুলো হলো পিপলু আর খানের ‘জয়া আর শারমিন’, নুরুল আলম আতিকের ‘মানুষের বাগান’ এবং একই উৎসবের প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে নির্বাচিত বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযোজনার মকবুল চৌধুরী পরিচালিত ‘মামুন-ইন প্রেইজ অব শ্যাডোজ’।
আগামী ৮ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার নন্দনে বসবে এই চলচ্চিত্র উৎসবের আসর। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্মাতাদের সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে এবারের নির্বাচিত ১৯টি ফিচার ফিল্ম। সেরা চলচ্চিত্রকে দেওয়া হবে বিমল রায় গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড এবং দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্র পাবে বিমল রায় সিলভার অ্যাওয়ার্ড। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচিত সিনেমাগুলোর জন্য এটি কেবল প্রদর্শনের সুযোগ নয়, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরারও গুরুত্বপূর্ণ একটি মঞ্চ।
দুই নারীর গল্পে ‘জয়া আর শারমিন’
পিপলু আর খানের ‘জয়া আর শারমিন’ নির্মিত হয়েছে দুই ভিন্ন শ্রেণির নারীর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। করোনাকালের লকডাউন যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে থামিয়ে দিয়েছিল, সেই বন্দিত্বই সিনেমাটির গল্পের মূল আবহ হয়ে উঠেছে।
গল্পের জয়া একজন অভিনেত্রী, আর শারমিন তার গৃহকর্মী। লকডাউনের কারণে দুজন একই বাড়িতে আটকে পড়েন। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার পর ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে তৈরি হয় নির্ভরতা ও ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্পর্কের আড়ালে থাকা শ্রেণিগত দূরত্ব, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং মানসিক চাপও সামনে আসতে থাকে। ফলে বন্ধুত্বের মতো শুরু হওয়া সম্পর্ক একসময় আরও জটিল রূপ নেয়।
৮৬ মিনিটের এই চলচ্চিত্রে জয়া ও শারমিন চরিত্রে অভিনয় করেছেন জয়া আহসান ও মহসিনা আক্তার। অতিথি চরিত্রে রয়েছেন তানজিম সাইয়ারা তটিনী। পিপলু আর খান ও নুসরাত ইসলাম মাটি যৌথভাবে সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন।
দেশে মুক্তির আগে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নানা পর্যায়ের কাজের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে সিনেমাটিকে। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ১৬ মে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘জয়া আর শারমিন’। পরে একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর সিনেমাটি মুক্তি দেওয়া হয় চরকিতে।
সিনেমাটির অন্যতম প্রযোজক ও গল্পরাজ্য ফিল্মসের কর্ণধার আবু শাহেদ ইমন বলেন, কলকাতার নন্দনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সিনেমার সঙ্গে ‘জয়া আর শারমিন’-এর প্রদর্শন সিনেমাটিকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করবে।
মানুষের গল্পে ‘মানুষের বাগান’
অন্যদিকে নুরুল আলম আতিকের ‘মানুষের বাগান’ যেন সমাজ ও জীবনের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সম্মিলিত এক প্রতিচ্ছবি। সিনেমাটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। শুটিং শেষ করতেই সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর। তবে নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও নানা কারণে দীর্ঘদিন মুক্তির অপেক্ষায় থাকতে হয় চলচ্চিত্রটিকে।
কলকাতার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও সাফল্যের দেখা পেয়েছে ‘মানুষের বাগান’। চলতি বছর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৫তম দিল্লি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে সিনেমাটি।
চলচ্চিত্রটির ভাবনার সঙ্গে এর পোস্টারের নকশাতেও রয়েছে প্রতীকী সম্পর্ক। একটি বিশাল গোল বাগানকে ঘিরে রয়েছেন নানা বয়স ও শ্রেণির মানুষ। কেউ গাছ লাগাচ্ছেন, কেউ ছবি আঁকছেন, কেউ মাটি খুঁড়ছেন, আবার কেউ যেন ক্লান্ত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কর্মকাণ্ড আলাদা হলেও তাদের সবার অবস্থান একই পৃথিবীর ভেতরে।
পরিচালক নুরুল আলম আতিক জানিয়েছেন, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের পাঁচটি গল্পকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে সিনেমাটির কাহিনি। ভিন্ন মানুষের জীবন, স্বপ্ন, সংকট ও বাস্তবতাকে একত্র করে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটির বয়ান।
‘মানুষের বাগান’-এর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মনোজ প্রামাণিক, অর্চিতা স্পর্শিয়া, মাহমুদ আলম, প্রসূন আজাদ, দীপান্বিতা মার্টিন, ইকবাল আহমেদ, জ্যোতিকা জ্যোতিসহ অনেকে।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও এক বাংলাদেশি সিনেমা
ফিচার ফিল্মের পাশাপাশি প্রামাণ্যচিত্র বিভাগেও থাকছে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব। মকবুল চৌধুরী পরিচালিত বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রযোজনার ‘মামুন-ইন প্রেইজ অব শ্যাডোজ’ এই বিভাগে প্রতিযোগিতা করবে। প্রামাণ্যচিত্র বিভাগে সেরা ও দ্বিতীয় সেরা চলচ্চিত্রের জন্য দেওয়া হবে হরিসাধন দাশগুপ্ত গোল্ডেন ও সিলভার অ্যাওয়ার্ড।
ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব ইন্ডিয়ার ইস্টার্ন রিজিয়নের আয়োজনে এবারের উৎসবে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি থাকছে বিশেষ আয়োজনও। জার্মান চলচ্চিত্র নির্মাতা আলেকজান্ডার ক্লুগের চলচ্চিত্র নিয়ে থাকছে বিশেষ পুনর্দর্শনী।
সব মিলিয়ে কলকাতার এবারের চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশের সিনেমার জন্য হতে যাচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ। একদিকে সমকালীন বাস্তবতা ও সম্পর্কের গল্প বলা ‘জয়া আর শারমিন’, অন্যদিকে সমাজের নানা শ্রেণির মানুষের জীবনকে এক সুতোয় বাঁধা ‘মানুষের বাগান’—দুটি ভিন্ন নির্মাণভাষার সিনেমাই এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। আর সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সিনেমা কতটা আলো ছড়াতে পারে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।


