আদালতের নথি চুরি করে জাল রায় তৈরির অভিযোগ, গ্রেপ্তার ‘আইনজীবীর সহকারী’

ঢাকার দুটি নিম্ন আদালত থেকে পৃথক দুটি মামলার মূল নথি চুরির ঘটনায় তদন্তে একই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পুলিশ। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দেওয়া আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেলকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে নিম্ন আদালতপাড়ায় জাল কাগজপত্র তৈরির একটি চক্রের তথ্যও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এজলাস থেকে প্রথমে অস্ত্র মামলার নথি চুরি

সূত্র জানায়, টাকা নেওয়ার পর আনোয়ারুল প্রথমে জামিলাকে একটি ভুয়া খালাসের নথি তৈরি করে দেন। কিন্তু কিছুদিন পর আদালত থেকে আবার আসামিকে হাজির হওয়ার সমন পাঠানো হলে জামিলার সন্দেহ হয়। তিনি বিষয়টি আনোয়ারুলকে জানালে জালিয়াতি আড়াল করতে এবং মামলা সত্যিই খালাস হয়েছে—এমন প্রমাণ দেখাতে আদালত থেকে মামলার মূল নথিই চুরির পরিকল্পনা করেন তিনি।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২ জুলাই বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে প্রবেশ করেন আনোয়ারুল। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে খিলগাঁও থানায় হওয়া ওই অস্ত্র মামলার নথি দেখতে চান তিনি।

আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাঁকে নথিটি দেখতে দেন। পরে বিচারকের ডাকে পাশের খাসকামরায় চলে যান নাজমুল। প্রায় পাঁচ মিনিট পর খাসকামরা থেকে ফিরে তিনি দেখতে পান, আনোয়ারুল সেখানে নেই এবং মামলার নথিটিও উধাও।

এরপর একই কায়দায় মাদক মামলার নথি

প্রথম ঘটনার পর গত ৩ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতে যান আনোয়ারুল। সেখানে রবিউল হকের বিরুদ্ধে করা একটি মাদক মামলার নথি দেখতে চান তিনি। আগের ঘটনার মতোই সেই নথিটিও চুরি করে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এ ঘটনায় আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।

দুটি মামলার তদন্তে নেমে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নথি চুরির ঘটনায় আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেলকে শনাক্ত করে। পরে গত ২১ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শ্যামপুরের একতা হাউজিং এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের তদন্তে জানা যায়, আনোয়ারুল আইনজীবী আবদুস সাত্তারের চেম্বারে পিয়ন হিসেবে কাজ করতেন। আইনজীবী আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, আনোয়ারুলের দায়িত্ব ছিল চা আনা এবং ফাইল রক্ষণাবেক্ষণ করা। প্রায় আড়াই বছর তাঁর চেম্বারে কাজ করার পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ থেকে হঠাৎ কাজে আসা বন্ধ করে দেন আনোয়ারুল।

আবদুস সাত্তার আরও বলেন, চেম্বার ছাড়ার আগে আনোয়ারুল সব মক্কেলের ফোন নম্বরের ছবি তুলে নিয়ে যান। পরে তিনি ওই ক্লায়েন্টদের ফোন করে মামলা খালাস ও জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রতারণা শুরু করেন। এমনকি আরেক ক্লায়েন্টের কাছ থেকেও জামিন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে দুই হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

কম্পিউটারের দোকান থেকে ভুয়া রায়ের কপি উদ্ধার

আনোয়ারুলকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতপাড়ার কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীবকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হাবীবের কম্পিউটারে থাকা একটি ফোল্ডার থেকে জামিলাকে দেওয়া দুটি মামলার খালাসের ভুয়া রায়ের কপিসহ অন্তত ১০টি মামলার ভুয়া রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করা হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেবাশীষ হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, হাবীবের কম্পিউটারে আদালতের নথিগুলো কীভাবে এসেছে এবং নথি চুরির ঘটনায় তাঁর কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে জালিয়াতিতে ব্যবহৃত নকল সিল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।

জামিলার আইনজীবী আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের নথি চুরির বিষয়ে জামিলা কিছুই জানতেন না। আনোয়ারুল নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে মামলা খালাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করেন। পরে আদালত থেকে মামলার মূল নথি চুরি করে সেটি জামিলার হাতে দিয়ে বলা হয়, ‘এটি আপনার স্বামীর খালাসের কাগজ, এটি যত্ন করে রাখুন।’

আইনজীবীর ভাষ্য, জামিলা সরল বিশ্বাসে নথিটি বাসায় রেখে দিয়েছিলেন। সেটি চুরি করা নথি—এ কথা জানলে তিনি কখনোই নিজের ঘরে রাখতেন না।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের এজলাস থেকে নথি চুরি এবং ভুয়া রায় তৈরি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। তাঁর মতে, এ ধরনের জালিয়াতি চক্রের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে কোনো আইনজীবী জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং বার কাউন্সিলের সদস্যপদ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।