সকালের নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা। সীমান্তের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ করে তিব্বতের পথে রওনা হওয়ার কথা ছিল। সন্তানদের সঙ্গে জীবনের বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত এক তীর্থযাত্রা—সেই আনন্দঘন যাত্রাই হঠাৎ বদলে গেছে অনিশ্চয়তায়। ওই সকালের পর থেকেই মুঠোফোনের ওপাশে আর কোনো কণ্ঠ নেই, কোনো বার্তা নেই, নেই নিশ্চিত কোনো খবরও। নেপাল-তিব্বত সীমান্তে (Nepal-Tibet Border) ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর এভাবেই উদ্বেগ আর অপেক্ষার মধ্যে দিন কাটছে অস্ট্রেলিয়ার কয়েক ডজন পরিবারের।
তবে এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই স্বস্তির একটি খবর এসেছে। নি’\খোঁজ বলে আশঙ্কা করা ২৬ বছর বয়সী অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক কারা সেভেরিনো পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি গোসাইকুন্ডা এলাকায় অন্য হাইকারদের সঙ্গে ছিলেন এবং এখন পায়ে হেঁটে কাঠমান্ডু ফেরার চেষ্টা করছেন।
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য দপ্তর (Australian Department of Foreign Affairs and Trade) জানিয়েছে, নি’\খোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা কাজ করছে। কিন্তু বিধ্বস্ত যোগাযোগব্যবস্থা, দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল এবং নতুন করে বন্যার আশঙ্কা উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৪১ জন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক এখনো নি’\খোঁজ রয়েছেন বলে শনিবার নিশ্চিত করেছেন অস্ট্রেলিয়ার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাট থিসলথওয়েট (Matt Thistlethwaite)। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন তীর্থযাত্রী, পর্যটক এবং একাধিক অস্ট্রেলিয়ান পরিবারের সদস্য। নি’\খোঁজ ৪১ জনের অনেকের পরিচয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা না গেলেও তিনটি ট্যুর কোম্পানি জানিয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩২ জন দুর্গম ওই চূড়া পরিদর্শনে গিয়েছিলেন।
নেপালি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ভয়াবহ এই দুর্যোগে মৃ’\তের সংখ্যা কয়েক শ ছাড়িয়েছে এবং নি’\খোঁজ রয়েছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বন্যার প্রবল স্রোত ও ভূমিধসে রাস্তা, সেতু, বাড়িঘর এবং যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে উদ্ধার তৎপরতাও বারবার বাধার মুখে পড়ছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ার পর সৃষ্ট ভূমিধস থেকেই এই ভয়াবহ জলপ্রবাহের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
স্ত্রীকে খুঁজতে নেপালে ছুটলেন স্বামী
নিউক্যাসলের র্যাঙ্কিন পার্কের ৪৬ বছর বয়সী রেশমা প্যাটেলের সর্বশেষ অবস্থান ছিল সীমান্তের একটি অভিবাসন ভবন। বন্যা আঘাত হানার কয়েক মিনিট আগেও সেখানে তাঁকে দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকেই তাঁর সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ নেই।
স্ত্রীর সন্ধানে আর অপেক্ষা করেননি তাঁর স্বামী। রেশমাকে খুঁজতে শুক্রবার সকালে নেপালের উদ্দেশে বিমানে উঠেছেন তিনি। পরিবার ও বন্ধুরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেশমার ছবি ছড়িয়ে দিয়ে তাঁর সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে জানানোর অনুরোধ করছেন।
সিডনির বারডিয়ার বাসিন্দা সুমি অধিকারীর সন্ধানেও নেপালে গেছেন তাঁর স্বামী কৈলাশ মনসোয়ার। সুমি একটি তীর্থযাত্রী দলের সঙ্গে ছিলেন। তাঁর সর্বশেষ অবস্থান জানা গেছে আইফোনের লোকেশন থেকে। সেই সূত্র ধরেই এখন স্ত্রীর সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন কৈলাশ।
‘এরপর আর কোনো খবর পাইনি’
নি’\খোঁজদের মধ্যে রয়েছেন সিডনির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মুরালিধরন পরিবারের চার সদস্য। শৈলজা মুরালিধরন (৪২), তাঁর স্বামী চন্দ্রশেখরন (৪৭) এবং তাঁদের দুই ছেলে অশ্বিন (১৪) ও আরুশ (১১) ছিলেন হিমালয়ান গ্লেসিয়ার অ্যাডভেঞ্চারস (Himalayan Glacier Adventures)-এর একটি দলের সঙ্গে।
পরিবারের সঙ্গে তাঁদের সর্বশেষ কথা হয়েছিল বুধবার সকালে। শৈলজার বোন বৈষ্ণবী জানিয়েছেন, তখন তাঁরা নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং সীমান্তে অভিবাসন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এরপরই হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
এখন পরিবারের একটাই আশা—তাঁরা হয়তো ভালো আছেন, কোনো নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং উদ্ধারের অপেক্ষা করছেন।
মুরালিধরন পরিবারের মতোই একই দুশ্চিন্তা নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন আরও বহু মানুষ। তাঁরা যে পর্যটক দলের সঙ্গে ছিলেন, সেই দলের ১৫ জন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক নি’\খোঁজ রয়েছেন। ট্যুর অপারেটরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাইডসহ ৪৭ সদস্যের ওই দলের সঙ্গে বন্যার দিন সকালে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
নি’\খোঁজের তালিকায় আরও পরিবার
চেরিব্রুকের শ্রীধরন ও লক্ষ্মী আইয়ার এবং তাঁদের দুই ছেলে ঋষভ (২৩) ও রুদ্র (২০)-এরও এখন পর্যন্ত কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবারের বন্ধুদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই ছেলেই চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছেন।
ঋষভ নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী, আর রুদ্র পড়ছেন ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরিবারের সদস্যরা এখন তাঁদের ফিরে আসার খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন।
পশ্চিম সিডনির ভেঙ্কটরামন বালাকৃষ্ণন (৫২) ও তাঁর স্ত্রী চিত্রা ভেঙ্কটরামন (৪৬)-ও একই দুর্যোগের পর নি’\খোঁজ। তাঁদের ছেলে জানিয়েছেন, সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে থাকা অবস্থায় বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়েছিল। এরপর থেকে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নি’\খোঁজদের তালিকায় রয়েছেন উমেশ শর্মা (৫৫) ও কৃষ্ণ শর্মা (৫০)-ও।
‘আমরা তাঁকে খুব মিস করি’
ব্রিসবেনের বাসিন্দা এবং রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান এয়ার ফোর্স (Royal Australian Air Force)-এর সদস্য ৪০ বছর বয়সী করণ ভরদ্বাজও নেপালে নি’\খোঁজ থাকা অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকদের একজন। তিনি ‘কৈলাস জার্নি’ ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন।
করণের বোন জেন নাই জানিয়েছেন, পরিবারের সবাই অধীর আগ্রহে তাঁর খবরের অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা অধীর আগ্রহে খবরের জন্য অপেক্ষা করছি এবং আমাদের সর্বস্ব দিয়ে প্রার্থনা করছি, সে যেন নিরাপদে থাকে এবং আমাদের কাছে বাড়ি ফিরে আসে।’
কুইন্সল্যান্ডের কানাগামাহ সুন্দরসানও ছিলেন তীর্থযাত্রায়। কৈলাস পর্বত (Mount Kailash) ভ্রমণ ছিল তাঁর বহুদিনের স্বপ্ন। কিন্তু বন্যার পর থেকেই মেয়ের সঙ্গে তাঁর আর কোনো যোগাযোগ নেই।
মেয়ে স্বাতিকা কান্নিয়াহ বলেন, ‘আমরা সত্যিই চাই তিনি বাড়ি ফিরে আসুন। আমরা তাঁকে খুব মিস করি।’


