নব্বই দশকের ঢালিউডের ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহর ৩০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মাত্র ২৪ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর অকালে মৃত্যুবরণ করেন জনপ্রিয় এই অভিনেতা। তাঁর মৃত্যু তিন দশক পেরিয়েও দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গন ও ভক্তদের মধ্যে আলোচনার অন্যতম বিষয় হয়ে আছে।
রাজধানীর নিউ ইস্কাটন রোডের ইস্কাটন প্লাজার নিজ ফ্ল্যাটে সিলিংফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় সালমান শাহকে পাওয়া যায় বলে তাঁর স্ত্রী সামিরা হক দাবি করেছিলেন। পরে তাঁকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর ময়নাতদন্ত হয়। তবে মৃত্যুর পর থেকেই সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়ে আসছিল—এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যা।
শাবনূরকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ কতটা সত্য?
সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে অভিনেত্রী শাবনূরকেও দায়ী করা হয়েছে। তবে তদন্তের তথ্য এবং বর্তমান আইনি অবস্থান একসঙ্গে বিবেচনা করলে বিষয়টি খুব সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। শাবনূরের নাম মূলত সালমান শাহর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন, বিভিন্ন ব্যক্তির অভিযোগ এবং ২০২০ সালের পিবিআই তদন্তের প্রসঙ্গে সামনে আসে। পিবিআই সালমানের সঙ্গে শাবনূরের সম্পর্ক এবং সেটিকে ঘিরে পারিবারিক বিরোধকে তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিল।
অন্যদিকে, মৃত্যুর আগে সালমান শাহ একটি সংবাদ সম্মেলন করে শাবনূরের সঙ্গে তাঁর বিয়ের গুঞ্জন প্রকাশ্যে অস্বীকার করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন, শাবনূরকে তিনি ছোট বোনের মতো দেখেন। পরবর্তী সময়ে অভিনেত্রী শাবনূরও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
নব্বই দশকের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন সালমান-শাবনূর। পর্দায় তাঁদের জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও সে সময় নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সালমান শাহর মৃত্যুর পর শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি সামনে আসে। তবে একটি বিষয় আলাদা করে স্পষ্ট করা প্রয়োজন—শাবনূর কখনো সালমান শাহর অপমৃত্যু কিংবা হত্যা মামলার আসামি ছিলেন না। যদিও পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও অভিযোগে তাঁকে দায়ী করার চেষ্টা করা হয়েছে।
২০২০ সালের পিবিআই তদন্তে শাবনূরের নামও আলোচনায় আসে। তদন্তের সময় সালমানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হয়। শাবনূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধও তদন্তের আলোচনায় আসে এবং এটিকে আত্মহত্যার পেছনে থাকা সম্ভাব্য কারণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তবে পিবিআইয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়নি। প্রতিবেদন প্রকাশের পর শাবনূরও প্রকাশ্যে পিবিআইয়ের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন।
২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর অস্ট্রেলিয়া থেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাবনূর বলেন, সালমান শাহ আত্মহত্যা করলেও তার জন্য তিনি কেন দায়ী হবেন? তিনি সালমানকে নিজের ভালো সহশিল্পী হিসেবে বর্ণনা করেন এবং তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।
সালমানের মামার প্রশ্ন
এদিকে সালমান শাহর মামা আলমগীর কুমকুমও বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে শাবনূরের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেছেন, সালমানের মৃত্যুর পর শাবনূর কেন তাঁর জানাজায় অংশ নেননি কিংবা সিলেটের বাসায় গিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করেননি—এসব বিষয় তাঁদের কাছে কষ্টের এবং প্রশ্নের ছিল।
মৃত্যু থেকে তদন্ত, তারপর দীর্ঘ আইনি লড়াই
সালমান শাহর মৃত্যুর পর রমনা থানা পুলিশ অপমৃত্যুর মামলা করে এবং ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করে তদন্ত শুরু করে। পরে পুলিশ, সিআইডি এবং সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঘটনাটি তদন্ত করে। বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী শুরু থেকেই এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন।
২০২০ সালে সালমান শাহর অপমৃত্যু মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পিবিআইয়ের সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেন সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলতে থাকে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে রমনা থানায় সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়।
ওই হত্যা মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্য আসামিরা হলেন—ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, খলচরিত্রের অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের মালিক রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ।
তিন দশক পরও সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে প্রশ্ন, অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের শেষ হয়নি। একদিকে রয়েছে বিভিন্ন সময়ের তদন্তে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে পরিবারের দীর্ঘদিনের দাবি ও পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া হত্যা মামলা। ফলে সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাটি আজও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে।


