যোগব্যায়ামের সরঞ্জাম ও পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান লুলুলেমন (Lululemon)-এর প্রতিষ্ঠাতা চিপ উইলসন (Chip Wilson) তার স্ত্রী শ্যানন উইলসন (Shannon Wilson)-এর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পথে এগোচ্ছেন। দীর্ঘদিনের এই দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার আইনি প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত উইলসনের জন্য বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। কারণ, তাদের মধ্যে বিয়ের আগে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে কোনো ‘প্রিনাপচুয়াল অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা পূর্বচুক্তি ছিল না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অনলাইন এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী চিপ উইলসন ও ৫২ বছর বয়সী শ্যানন উইলসন ২০০২ সালে বিয়ে করেন। এখন কানাডার বৃটিশ কলাম্বিয়া (British Columbia) প্রদেশে তাদের বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এ দম্পতিকে ঘিরে একটি পারিবারিক আইনসংক্রান্ত মামলা চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রদেশটির সুপ্রিম কোর্টে শুরু হয়। তবে মামলার বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের হিসাবে, বর্তমানে উইলসনের মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬১০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময়ের বৈবাহিক সম্পর্ক ভাঙার এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সম্পদের সম্ভাব্য বণ্টন স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
ভ্যাঙ্কুভারের পারিবারিক আইনজীবী ও সালিসকারী জর্জিয়ালি ল্যাং জানিয়েছেন, বৃটিশ কলাম্বিয়ার আইন অনুযায়ী সাধারণভাবে স্বামী ও স্ত্রী পারিবারিক সম্পত্তির সমান অংশ পাওয়ার অধিকার রাখেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শ্যানন উইলসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিপ উইলসনের মোট সম্পদের অর্ধেক পেয়ে যাবেন। কোন সম্পত্তি কখন অর্জিত হয়েছে, বিয়ের সময় সেই সম্পদের অবস্থান কী ছিল এবং পরে তার মূল্য কীভাবে বেড়েছে—চূড়ান্ত বণ্টনে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ল্যাংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, চিপ উইলসন যদি আদালতে প্রমাণ করতে পারেন যে নির্দিষ্ট কোনো সম্পদ বিয়ের আগে কিংবা শ্যাননের সঙ্গে একসঙ্গে বসবাস শুরু করার আগেই তার মালিকানায় ছিল, তাহলে সম্পর্ক শুরুর সময় ওই সম্পদের যে মূল্য ছিল, সেই অংশ তিনি নিজের কাছে রাখতে পারবেন। তবে তাদের সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর সেই সম্পদের মূল্য যতটা বেড়েছে, বর্তমান মূল্য ধরে সেই বৃদ্ধির অংশ উভয়ের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এই জায়গাতেই লুলুলেমনের সঙ্গে উইলসনের দীর্ঘ ব্যবসায়িক ইতিহাস বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। চিপ উইলসন ১৯৯৮ সালে লুলুলেমন প্রতিষ্ঠা করেন। অর্থাৎ শ্যাননকে বিয়ে করার চার বছর আগেই কোম্পানিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে তিনি সরাসরি কোম্পানি পরিচালনার কেন্দ্রে না থাকলেও লুলুলেমনের অন্যতম বড় শেয়ারহোল্ডার হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছেন।
সাম্প্রতিক সিকিউরিটিজ ফাইলিং অনুযায়ী, উইলসন এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পারিবারিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো লুলুলেমনের প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। সম্প্রতি ওই শেয়ারগুলোর বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি ছিল। ফলে বিবাহবিচ্ছেদের সম্পত্তি বণ্টনে লুলুলেমনের এই শেয়ারগুলোর কতটা অন্তর্ভুক্ত হবে কিংবা এগুলোর মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে হিসাব করা হবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
তবে লুলুলেমনই চিপ উইলসনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বিনিয়োগ নয়। তার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয় ফিনল্যান্ডের স্পোর্টসওয়্যার কোম্পানি আমের স্পোর্টস (Amer Sports)-এ থাকা প্রায় ১৮ শতাংশ অংশীদারিত্ব। এই বিনিয়োগের মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি ডলার।
আমের স্পোর্টসের মালিকানাধীন পরিচিত ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্কটেরিক্স, সলোমন এবং টেনিস সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী ব্র্যান্ড উইলসন। ফলে চিপ উইলসনের মোট সম্পদের বড় একটি অংশই বিভিন্ন ক্রীড়া ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ডে তার বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত।
শুধু শেয়ার বা স্পোর্টসওয়্যার কোম্পানিতেই নয়, আবাসন খাতেও চিপ উইলসনের উল্লেখযোগ্য সম্পদ রয়েছে। তার পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান হাউস অব উইলসন (House of Wilson)-এর মাধ্যমে তিনি ‘লো টাইড প্রপার্টিজ’-এ বিনিয়োগ করেছেন। এই প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিওতে ভ্যাঙ্কুভার ও সিয়াটল এলাকার একাধিক সম্পত্তি রয়েছে।
ফোর্বসের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সে সময় লো টাইডের সম্পদভাণ্ডারে উইলসনের অংশীদারিত্ব এবং ভ্যাঙ্কুভারে তার ব্যক্তিগত প্রাসাদের মূল্য একসঙ্গে প্রায় ৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছিল। এর মধ্যে ভ্যাঙ্কুভারের সমুদ্রতীরবর্তী বাড়িটি আলাদাভাবেও বিপুল মূল্যের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
২০২৬ সালের মূল্যায়নে ওই বাড়িটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ কোটি ৩০ লাখ ডলার। তবে চলতি বছরের শুরুতে একটি আপিলের পর বাড়িটির আগের মূল্যায়ন প্রায় ৬ কোটি ডলার থেকে কমিয়ে প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ ডলার করা হয়েছিল। ফলে সম্পত্তিটির মূল্যায়ন নিয়েও এরই মধ্যে ওঠানামা দেখা গেছে।
অন্যদিকে, শ্যানন উইলসনের সঙ্গেও লুলুলেমনের সম্পর্ক কেবল প্রতিষ্ঠাতার স্ত্রী হিসেবে নয়। কোম্পানির শুরুর সময় তিনি লুলুলেমনের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান ডিজাইনারের দায়িত্বে ছিলেন এবং ব্র্যান্ডটির প্রাথমিক পর্যায়ের বেশ কিছু পণ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে শ্যানন ও চিপ উইলসন যৌথভাবে ‘হাউস অব উইলসন’ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১২ সালে তারা একসঙ্গে ‘উইলসন ৫ ফাউন্ডেশন’ও গড়ে তোলেন। অর্থাৎ তাদের পারিবারিক সম্পর্কের পাশাপাশি ব্যবসা, বিনিয়োগ ও দাতব্য কার্যক্রমেও দীর্ঘদিনের যৌথ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
সাম্প্রতিক একটি সিকিউরিটিজ ফাইলিংয়ে উপকারভোগী মালিকানা বা ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ’ সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী লুলুলেমনের প্রায় ১ শতাংশ শেয়ারের সঙ্গে শ্যাননের নামও যুক্ত করা হয়েছে। তবে ওই শেয়ারের পুরো অংশ সরাসরি তার ব্যক্তিগত মালিকানায় নয়। এর একটি অংশ সরাসরি শ্যাননের, আর বাকি অংশ পারিবারিক ফাউন্ডেশনের মালিকানাধীন।
সব মিলিয়ে, চিপ ও শ্যাননের বিবাহবিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়াটি শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবসানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিলিয়ন ডলারের শেয়ার, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ এবং বিপুল রিয়েল এস্টেট সম্পদ। তবে বৃটিশ কলাম্বিয়ার পারিবারিক আইন এবং সম্পদ অর্জনের সময়কাল বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত কে কতটা পাবেন, তা আদালতের প্রক্রিয়া ও সম্পত্তির বিস্তারিত মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে।
এই দম্পতির পাঁচ ছেলে নিয়ে একটি মিশ্র পরিবার রয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন চিপ ও শ্যাননের দু’জনের সন্তান।


