পটুয়াখালী-৩ আসনে জোট সিদ্ধান্তে ভাঙন: নুরের বিপক্ষে অনড় তৃণমূল বিএনপি, মাঠে সক্রিয় তৃণমূল আওয়ামী লীগ


গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর (Nurul Haq Nur)-এর পক্ষে কাজ না করায় পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা ও দশমিনা) আসনের বিএনপি কমিটি বিলুপ্ত করা হলেও, তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ নেতাকর্মীরা। বরং স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুন (Hasan Mamun)-এর পক্ষে আরও শক্ত অবস্থান নিয়ে তারা প্রকাশ্যে মিষ্টি বিতরণ করে নিজেদের অনড় অবস্থান জানিয়েছেন।

স্থানীয় পর্যায়ে এ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে রাজনীতির সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠছে। নুরের জন্য দুঃসংবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামা। স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, প্রচারণার প্রথম দিন থেকেই তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসান মামুনের নির্বাচনী কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল হিসেবে গণঅধিকার পরিষদ (Gono Odhikar Parishad)-এর সভাপতি নুরুল হক নুরকে কেন্দ্র থেকে জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পটুয়াখালী-৩ (Patuakhali-3) আসনে চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেননি তৃণমূল বিএনপির বড় একটি অংশ।

এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন। দলমত নির্বিশেষে গলাচিপা ও দশমিনার তৃণমূলে সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ তাকে এলাকার ‘আশীর্বাদ’ হিসেবেই দেখে আসছে।

কেন্দ্র থেকে জোট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নুরুল হক নুরের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ এলেও তৃণমূল বিএনপি তা মানতে নারাজ। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন হাসান মামুন এবং পরদিন ২৯ ডিসেম্বর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

জোটের প্রার্থী নুরের পক্ষে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঠে না পেয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলায় দুই দিনের সাংগঠনিক সফর করেন। এ সময় পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুট্টি ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান টোটনসহ শীর্ষ নেতারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। তবুও তৃণমূলের অবস্থানে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এদিকে তৃণমূল বিএনপির পর এবার নুরকে হটাতে মাঠে নামছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ৫ আগস্টের পর যারা বিএনপি ও পুলিশের ভয়ে এলাকা ছেড়ে বাইরে অবস্থান করছিলেন, তাদের অধিকাংশই এখন এলাকায় ফিরে এসেছেন। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাসান মামুনের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দশমিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন এবং উপজেলা যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, দলীয় পদধারী নেতারা সরাসরি মাঠে না নামলেও তৃণমূলের কর্মীদের হাসান মামুনের পক্ষে কাজ করতে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর পেছনে তারা একাধিক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ তুলে ধরেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হ’\ত্যা’\র সঙ্গে জড়িত ছিলেন গলাচিপার লে. কর্নেল এ কে এম মহিউদ্দিন ও মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি)। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি তাদের ফাঁসির মাধ্যমে গলাচিপা-দশমিনার মানুষ কলঙ্কমুক্ত হয়। তাদের অভিযোগ, ২০২৪ সালে শেখ হাসিনাকে হ’\ত্যা’\র পরিকল্পনাকারী ছিল ‘মোসাদের এজেন্ট’ নুর, যিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার অন্যতম কারিগর বলেও তারা দাবি করেন।

তাদের আরও বক্তব্য, নুর প্রতিদিন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে নিয়ে আক্রমণাত্মক ও অশ্রাব্য বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা জীবিত রয়েছেন বলেও তারা মন্তব্য করেন।

তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্পষ্ট ভাষায় জানান, যে ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে হ’\ত্যা’\র পরিকল্পনায় জড়িত বলে তারা বিশ্বাস করেন, তাকে কোনো অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত গলাচিপা-দশমিনা থেকে সংসদ সদস্য হতে দেওয়া হবে না।

তারা আরও বলেন, কেন্দ্রীয় চাপের কারণে ২০ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়েছিল—হাসান মামুন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন কি না তা দেখার জন্য। যেহেতু হাসান মামুনের প্রতীক ধানের শীষ নয়, তাই তার পক্ষে কাজ করতে ও ভোট চাইতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কোনো দ্বিধা নেই বলেও তারা দাবি করেন।