রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প (Rooppur Nuclear Power Plant)-এ নিয়োগে অনিয়ম, জাল সনদ ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভিযোগ নিয়ে ‘আমার দেশ’-এ অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে নড়েচড়ে বসেছে বিচার বিভাগ। জনস্বার্থে দায়ের করা রিট আবেদনের শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
রোববার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাকিনা বেগম (Sakina Begum)-এর দায়ের করা জনস্বার্থে রিট পিটিশন নং ২০৪২/২০২৬-এর শুনানি শেষে বিচারপতি আহমেদ সোহেল (Ahmed Sohel) ও ফাতেমা আনোয়ার (Fatema Anwar)-এর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে আট সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
গত বছরের ২৭ আগস্ট ‘মোটা অঙ্কের ঘুষে বড় পদ, জাল সনদে স্থায়ী চাকরি’ শিরোনামে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকল্পের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং জাল সনদের মাধ্যমে স্থায়ী নিয়োগের অভিযোগ তুলে ধরা হয়। কয়েকজন কর্মকর্তার পেশাগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়। নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী জনস্বার্থে রিট দায়ের করেন। রিটে উল্লেখ করা হয়, গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন কার্যকর তদন্তে উদ্যোগ না নেওয়ায় বিচারিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ জানতে চান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। একই সঙ্গে অভিযোগসমূহের বিষয়ে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রামাণ্য তদন্ত নিশ্চিতের নির্দেশ দেওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই, অভিজ্ঞতার মানদণ্ড, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং প্রাসঙ্গিক নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করতে বলা হয়েছে।
আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আওতায় প্রকল্পের বিভিন্ন পদে একাধিক কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ ছিল না এবং যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই কিছু নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
অভিযোগের তালিকায় রয়েছে—চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ভারপ্রাপ্ত) মুশফিকা আহমেদকে ব্যবস্থাপক পদে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে নিউক্লিয়ার ফ্যাসিলিটি বা পাওয়ার প্লান্টে কমপক্ষে ৯ বছরের অভিজ্ঞতা আবশ্যক থাকলেও তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপক পদে আল মামুন ও নাজমুল হোসেনের প্রায় এক বছরের অভিজ্ঞতা ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। উপব্যবস্থাপক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত আবু কায়সারের প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ছিল না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন সরকারি ব্যবস্থাপক পদে রবিউল ইসলামের বিদ্যুৎ খাতে প্রত্যক্ষ কাজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি পলিটেকনিকে চাকরি করে বিদ্যুৎ সেক্টরের একটি ভুয়া সনদ দিয়ে নিয়োগ পান—এমন অভিযোগও রয়েছে। একই পদে মেরাজ আল মামুনের বিরুদ্ধেও জাল সনদের অভিযোগ উঠেছে।
বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, রূপপুরের মতো কৌশলগত ও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক অবকাঠামো প্রকল্পে মানবসম্পদ নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা অনুসরণ অপরিহার্য। এ ধরনের অভিযোগ প্রকল্পের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা, সুশাসন কাঠামো এবং সেফটি কালচার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
