নতুন সরকারের সূচনাতেই সচিবালয়ে পিএস-এপিএস নিয়োগে জোর তৎপরতা, তদবির-অনাগ্রহ দুই-ই স্পষ্ট

বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সচিবালয়ের পরিবেশে এক ধরনের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কক্ষে কর্মকর্তাদের আনাগোনা বেড়েছে, কোথাও ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা, কোথাও আবার নীরব তদবির। দায়িত্ব গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতার আড়ালেই শুরু হয়েছে একান্ত সচিব (পিএস) ও সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) নিয়োগ ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা।

সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোতে পিএস নিয়োগে চলছে যাচাই-বাছাই। দলীয় নেতাদের পছন্দের কর্মকর্তাদের নামও ঘুরছে আলোচনায়। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবদিক বিবেচনা করেই যোগ্যদের বাছাই করা হচ্ছে।

ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed)-এর একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপসচিব মুহাম্মদ হাসনাত মোর্শেদ ভূঁইয়া। তিনি এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাস্থ্যখাতে দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের একান্ত সচিব হয়েছেন উপসচিব এ বি এম ইফতেখারুল খন্দকার।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমের একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সরিষাবাড়ী উপজেলার নির্বাহী অফিসার তাসনিমুজ্জামান। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হয়েছেন সিনিয়র সহকারী সচিব সামিউল আমিন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তাছবীর হোসেন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মাহবুবুর রহমান।

এছাড়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এবং উপদেষ্টা মাহদী আমিনের (প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা) একান্ত সচিবও ইতোমধ্যে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। বাকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পিএস ও এপিএস নিয়োগও দ্রুত সম্পন্ন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উপসচিব জানান, তিনজন মন্ত্রীর একান্ত সচিব হওয়ার প্রস্তাব তার কাছে এসেছিল, তবে তিনি নিজে আগ্রহ দেখাননি। বরং নিজের ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করেছেন। অন্যদিকে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রীর একান্ত সচিব হওয়ার জন্য অনেকেই তদবির করছেন। কারণ ভবিষ্যতে জেলা প্রশাসক হওয়ার দৌড়ে পিএস হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা বাড়তি সুবিধা দেয়।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রীরা তাদের একান্ত সচিব নির্বাচনে মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেন। তবে যারা দক্ষ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং কাজ বোঝেন, তারাই সাধারণত এ পদে বেশি গ্রহণযোগ্য হন।

তবে ভিন্ন সুরও শোনা যাচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এবার অনেকেই একান্ত সচিবের পদে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। তাদের আশঙ্কা—মন্ত্রীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করলে পরবর্তীতে পদোন্নতির সময় নানা প্রশ্ন ওঠে। “অমুক মন্ত্রীর লোক” তকমা লাগার ঝুঁকি থেকে যায়। ভালো কাজ করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন মেলে না, বরং বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও প্রতিমন্ত্রীর এপিএস নিয়োগ

এরই মধ্যে ছয়জন মন্ত্রী, মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এবং দুইজন প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) হিসেবে মোট ৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৯ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (Ministry of Public Administration) এ তথ্য জানায়।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir)-এর এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মো. ইউনুস আলী। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের এপিএস হয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মো. আকবর হোসেন। ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনুর এপিএস হয়েছেন আল মুনজির বিন ওবায়েদ। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানমের এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আবদুল আউয়াল। খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদের এপিএস হয়েছেন আমিনুল ইসলাম।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) ইসমাইল জবিউল্লাহর এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মীর সোলাইমান। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এপিএস হয়েছেন তৌহিদুল ইসলাম। আর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর (Nurul Haque Nur)-এর এপিএস হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের উপসহকারী পরিচালক মো. খাইরুল আমিন।

নতুন সরকারের শুরুতেই পিএস-এপিএস নিয়োগ ঘিরে যে তৎপরতা ও অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ দেখা যাচ্ছে, তা প্রশাসনের ভেতরের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ পদোন্নতির সমীকরণ—দুটোকেই স্পষ্ট করে দিচ্ছে।