ঢাকা–১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান (Mir Ahmad Bin Kasem Arman) বলেছেন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ‘নগদ’-এ বিনিয়োগের যে প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর গভর্নরের কাছে পাঠানো হয়েছে, সেটি তার ব্যক্তিগত কোনো উদ্যোগ নয়; বরং বিদেশি মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পাঠানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠকটি হয় নগদে সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে চলমান আলোচনার ধারাবাহিকতায়।
তিনি বলেন, “আমি বিভিন্ন দেশের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সঙ্গে কাজ করি। তারা নগদে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের প্রস্তাবগুলোই আমি গভর্নরের কাছে পাঠিয়েছি।”
কোন কোন প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছে—এ প্রশ্নে তিনি নাম প্রকাশে অনীহা জানান। তার ভাষ্য, “যেহেতু বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তাই এই মুহূর্তে তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।”
গভর্নর কোনো আশ্বাস দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, “আমি প্রস্তাবটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পাঠিয়েছিলাম। এখন নতুন সরকার দায়িত্বে রয়েছে। গভর্নর জানিয়েছেন, নগদের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের চূড়ান্ত নীতি কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা অন্তর্বর্তী সরকারের মতো এটি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছেড়ে দেবে, তাহলে বিনিয়োগের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে।”
সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, বরং একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন—এমন ব্যাখ্যাও দেন তিনি। বলেন, “আমি একজন পেশাদার আইনজীবী। এর আগে ডেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও উবারের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমানে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের জন্য কাজ করছি এবং তাদের আইনি সহায়তা দেব।”
সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তি খাতে অভিজ্ঞ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে আগ্রহী। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই তারা বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছিলেন এবং সরকারের সঙ্গে আলোচনার সময় সেই আগ্রহের বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
নগদে বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না—এ প্রশ্নে তিনি জানান, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা একটি অডিট করতে আগ্রহী। এ বিষয়টি গভর্নরকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি একজন উদ্যোক্তা পরিবারের সদস্য হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাকে বেছে নিয়েছেন। সংসদ সদস্য হিসেবে এই দায়িত্ব পালন কোনো স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে না। রাজনীতি করছি জনগণের সেবার জন্য, আর জীবিকা নির্বাহের জন্য আইন পেশায় নিয়োজিত আছি। এখানে কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব নেই।”
তিনি আরও বলেন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বর্তমান সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে আন্তরিক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই নগদে বিনিয়োগের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশ করেন। এর আগে গত বছরের ২৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন, নগদকে ডাক অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং নতুন বিনিয়োগকারী খোঁজা হবে।
গভর্নর তখন বলেছিলেন, “নগদের মালিকানা তিন থেকে চার মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কারণ এটি পরিচালনার মতো সক্ষমতা ডাক অধিদপ্তরের নেই।”
২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে নগদ (Nagad)। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সও দেওয়া হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ (Awami League) সরকারের সময় প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ম ভেঙে সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দেয়। তবে পরে উচ্চ আদালত তা অবৈধ ঘোষণা করলে ডাক অধিদপ্তর এর দায়িত্ব নেয়।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারিতে নগদের বিরুদ্ধে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় বলা হয়, ২০২৪ সালের ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে বিভিন্ন ব্যাংকের ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট হিসাবের বিপরীতে ১০১ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রশাসক দলের পর্যবেক্ষণে ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ঘাটতিসহ আরও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।
গত সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে ব্যারিস্টার আরমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি দিয়ে নগদে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কথা জানান এবং এ বিষয়ে ফরেনসিক অডিটের প্রতিবেদন চান।


