সিলেটের সাদাপাথর এলাকার দায়িত্বে থাকা এসআই কামরুল আলমকে ঘিরে এক রহস্যময় ঘটনা রাত থেকেই তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সিলেট শহরতলীর এয়ারপোর্ট এলাকার একটি পুলিশ চেকপোস্টে তার ব্যবহৃত প্রাইভেটকার ও পুলিশের ওয়াকিটকিসহ দু’জনকে আটক করা হয়। আটক দু’জনের একজন কোম্পানীগঞ্জের সাংবাদিক লিটন মাহমুদ। তবে শুধু গাড়ি বা ওয়াকিটকি নয়, গাড়ির ভেতর থেকে একটি চাইনিজ কুড়াল উদ্ধারের পরই সন্দেহ ঘনীভূত হয়।
পুলিশ সূত্র জানায়, যে সড়কে গাড়িটি আটক করা হয়, সেই রুটে প্রায়ই ডা’\কা’\তি ঘটে। ফলে চেকপোস্টে থাকা সদস্যদের সন্দেহ জাগে। কী উদ্দেশ্যে এ সব সরঞ্জাম নিয়ে চলাচল করা হচ্ছিল—তা জানতে আগ্রহ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ। তবে গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত অনুসন্ধানে নিশ্চিত কোনো তথ্য পায়নি তারা। এ অবস্থায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
এয়ারপোর্ট থানার ওসি মোবাশ্বের হোসেন মানবজমিনকে বলেন, চেকপোস্টের সিগন্যালে একটি প্রাইভেটকার আটক করা হয়। গাড়ির ভেতরে পুলিশের একটি ওয়াকিটকি পাওয়া যায়। এরপর তল্লাশিতে মেলে একটি চাইনিজ কুড়াল। তিনি জানান, আটকের পর খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ওয়াকিটকি ও প্রাইভেটকার দুটিই ভোলাগঞ্জ ফাঁড়ির এসআই কামরুলের। তবে গাড়িতে চাইনিজ কুড়াল থাকায় সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এ কারণেই দু’জনকে আটক করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। টনক নড়ে ভোলাগঞ্জ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই কামরুলের। তিনি রাতেই ওয়াকিটকি হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে কোম্পানীগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কিন্তু প্রাইভেটকার সম্পর্কে কোনো আইনগত উদ্যোগ নেননি। এতে করে তার ভূমিকাকে ঘিরে নাটকীয়তার অভিযোগ উঠেছে এবং নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুর রহমান খান মানবজমিনকে জানান, ওয়াকিটকি হারানোর বিষয়ে একটি জিডি হয়েছে। তবে আটক প্রাইভেটকার সম্পর্কে তাদের কিছু জানানো হয়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট থানায় মামলা হচ্ছে। তদন্তেই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে। সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও জানান, ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত এসআই কামরুল ইসলামকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
এরই মধ্যে ভোলাগঞ্জ এলাকায় এসআই কামরুল আলমকে ঘিরে পুরনো অভিযোগগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে উত্তোলিত পাথর থেকে বেপরোয়া চাঁদাবাজি করে আসছেন। এ বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের কাছে একাধিক অভিযোগ গেলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে চাঁদা দিলেই পাথরবাহী গাড়ি নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে। চাঁদা না দিলে গাড়ি ধরে ফাঁড়িতে আটকে রাখা হয়। পরে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ছাড়া হয়। মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েও চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
চেকপোস্টে আটক হওয়া সাংবাদিকসহ দুইজনকে এসআই কামরুলের দু’\র্নী’\তির সহযোগী বলেও দাবি করেন স্থানীয়রা। কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুর পশ্চিম ইউনিয়নের জালিয়ারপাড় গ্রামের আবুল মিয়া জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের কয়েকদিন আগে তার একটি ট্রাক্টর ফাঁড়িতে নিয়ে আটক করেন কামরুল। পরে ৮০ হাজার টাকা নিয়ে গাড়ি ছাড়েন।
বাহাদুরপুর গ্রামের রতন মিয়া জানান, সম্প্রতি তার একটি ট্রাক্টর নোয়াগাঁও মাদ্রাসা সংলগ্ন রাজুর বাড়ির রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যান কামরুল। পরে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে আনেন তিনি। শারপিনের ইব্রাহিম বলেন, নির্বাচনের দুইদিন আগে পাড়ুয়া উজানপাড়া এলাকায় তার পাথরবাহী গাড়ি আটক করা হয়। ঘটনাস্থলেই ৪০ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়ান তিনি।
স্থানীয়রা আরও জানান, চাঁদা না দেওয়ায় নির্বাচনের দুইদিন আগে পাড়ুয়া তিনতলা বিল্ডিংয়ের পেছনে ইদ্রিস আলী নামে এক ব্যক্তিকে মা’\রধ’\র করেন কামরুল। এতে উত্তেজিত জনতা তাকে ধাওয়া করে। পরে ওসি ঘটনাস্থলে গিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে ৪০ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করেন কামরুল—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের।
একটি চেকপোস্টে আটক হওয়া গাড়ি থেকে শুরু হওয়া ঘটনা এখন রীতিমতো বহুমাত্রিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি কী দাঁড়ায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।


