আফগানিস্তানের কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে শুক্রবার ভোরে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। অন্যদিকে আফগানিস্তানের তালেবান জানায়, তারা যৌথ সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা চালিয়ে জবাব দিয়েছে। পাল্টাপাল্টি এই অভিযানে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বলেছে, আফগান শহরগুলোতে তাদের ‘পাল্টা হামলা’ ছিল ‘আফগান হামলার’ জবাব। তবে আফগান তালেবান দাবি করেছে, সেগুলো ছিল আগের পাকিস্তানি হামলার প্রতিক্রিয়া।
আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ (Zabihullah Mujahid) নিশ্চিত করেছেন যে পাকিস্তান রাজধানী কাবুল, পাকতিকা ও কান্দাহারের কিছু স্থানে বোমা হামলা চালিয়েছে। তবে তার দাবি, এসব হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কাবুলে অবস্থানরত এএফপি সংবাদদাতারা জানান, ভোরের দিকে জোরালো বিস্ফোরণে রাজধানী কাবুল কেঁপে ওঠে। স্থানীয় সময় রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে যুদ্ধবিমানের শব্দের সঙ্গে বিস্ফোরণের আওয়াজ শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া কেন্দ্রীয় কাবুলে প্রায় ২টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত দফায় দফায় গু’\লির শব্দ শোনা গেছে।
এর আগে পাকিস্তান জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে যৌথ সীমান্তে সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে আফগান তালেবান অভিযান চালানোর পর তাদের দুই সৈন্য নি’\হত হয়েছে। সাম্প্রতিক সংঘর্ষে উভয় পক্ষই একে অপরের বড় ক্ষতি করার দাবি করেছে। পাকিস্তানের সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, তারা বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন এবং নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ (Shehbaz Sharif) বলেছেন, তাদের বাহিনী যেকোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে নস্যাৎ করতে সক্ষম। পাকিস্তান সরকারের এক্স অ্যাকাউন্টে দেওয়া একাধিক পোস্টে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, স্বদেশের প্রতিরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপস করা হবে না এবং প্রতিটি আগ্রাসনের উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার (Attaullah Tarar) জানান, কাবুল, পাকতিকা ও কান্দাহারে আফগান তালেবানের প্রতিরক্ষা ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, পাকিস্তানের হামলায় আফগান তালেবানের ১৩৩ সদস্য নি’\হত এবং ২০০-র বেশি আহত হয়েছে। আফগানিস্তানের সঙ্গে ‘প্রকাশ্য যু’\দ্ধ’ শুরু হয়েছে বলেও এক্স পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তাদের হামলায় ৫৫ জন পাকিস্তানি সৈন্য নি’\হত হয়েছে এবং অনেককে আটক করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাত ১২টায় উপ-আমিরের নির্দেশে হামলা বন্ধ করা হয়। তবে হতাহতের যে সংখ্যা দুই পক্ষ তুলে ধরছে, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কঠিন।
‘সরাসরি যু’\দ্ধ’ ঘোষণা
উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আফগান তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে ‘যু’\দ্ধ’ ঘোষণা করেন। একাধিক বিমান হামলার পর তিনি এক্সে লেখেন, পাকিস্তান সরাসরি এবং বন্ধু দেশগুলোর মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে, পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে’—এখন ‘সরাসরি যু’\দ্ধ’।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি (Asif Ali Zardari) শুক্রবার সকালে এক্সে লেখেন, তাদের সশস্ত্র বাহিনীর জবাব ছিল সর্বাত্মক ও দৃঢ়। যারা শান্তিকে দুর্বলতা মনে করবে, তারা কঠোর জবাব পাবে—এমন বার্তাও দেওয়া হয়।
সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই (Hamid Karzai) কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিকা প্রদেশে পাকিস্তানের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি বলেন, আফগানরা পূর্ণ ঐক্যের মাধ্যমে নিজেদের ভূখণ্ড রক্ষা করবে এবং সাহসের সঙ্গে আগ্রাসনের জবাব দেবে।
পরিস্থিতির অবনতি
গত ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানে রাতভর একাধিক বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। নিজ ভূখণ্ডে আত্মঘাতী বিস্ফোরণের পর আফগানিস্তানের ভেতরে অভিযান চালানোর কথা জানায় ইসলামাবাদ। পাকিস্তান-আফগান সীমান্তের কাছে সাতটি জঙ্গি ক্যাম্প ও আস্তানাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে বলে তারা নিশ্চিত করে।
অন্যদিকে কাবুলের দাবি, বেসামরিক বাড়ি ও একটি ধর্মীয় স্কুল লক্ষ্যবস্তু হয়েছে এবং নি’\হতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। আফগান তালেবান জানায়, তারা এ হামলার জবাবে ‘বড় আকারের’ অভিযান শুরু করেছে এবং অন্তত ১৮ জন নি’\হতের দাবি করেছে। ইসলামাবাদ এসব দাবি অস্বীকার করে।
যৌথ সীমান্তে ‘উসকানিবিহীন গু’\লি’র জবাব দিতে গিয়ে তাদের দুই সৈন্য নি’\হত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছে বলে পরে পাকিস্তান নিশ্চিত করে।
বৃহস্পতিবার রাতে তালেবান সরকার সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি সেনা চেকপোস্টকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘোষণা দিলে উত্তেজনা আরও বাড়ে। জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক্সে লিখেছিলেন, শুক্রবার ভোরে কান্দাহার ও হেলমান্দে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হয়েছে। তবে সেই পোস্ট পরে মুছে ফেলা হয়, এবং এ বিষয়ে তালেবানের কাছ থেকে এখনো নিশ্চিত তথ্য মেলেনি।
গত বছরের অক্টোবর মাসে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও কাবুল ও কান্দাহারে সাম্প্রতিক এই হামলা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান সংঘর্ষের সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।


