বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গভর্নর পদে আহসান এইচ মনসুরকে বুধবার সরানোর প্রক্রিয়া চলাকালে যে ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়, তা শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি—বরং দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বা তথাকথিত ‘মব’ সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গভর্নরের উপদেষ্টাসহ তিন কর্মকর্তাকে জোর করে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে সরকারের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ও দলীয় শৃঙ্খলা নিয়ে।
এই ঘটনার পেছনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-সমর্থিত কর্মকর্তাদের দায়ী করা হচ্ছে বলে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বরিশাল আদালত এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of Bangladesh) প্রাঙ্গণেও যে হট্টগোল, হা’\মলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে, সেখানেও বিএনপিপন্থীদের বিরুদ্ধে ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে।
সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মাজারে হা’\মলা, অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ‘মব কালচার’ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। অথচ নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) ঘোষণা দিয়েছিলেন—“মব কালচার শেষ”। কিন্তু দশ দিনের মাথায় নতুন সরকারকেও একই ধরনের অভিযোগের মুখে পড়তে হয়েছে।
বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-এর আমির শফিকুর রহমান (Shafiqur Rahman) বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনাকে “বর্তমান সরকার সমর্থিত মব কালচারের আনুষ্ঠানিক সূচনা” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, মবের মতো ঘটনায় দ্রুত আইনের প্রয়োগই হতে পারে নিয়ন্ত্রণের একমাত্র পথ। তার ভাষায়, “দ্রুততম সময়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সরকারই মব নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকে যা ঘটল
বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর গভর্নর থাকাকালে আহসান এইচ মনসুরের কয়েকটি সিদ্ধান্তে কর্মকর্তাদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। এর জেরে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। তিন কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও পরে ঢাকার বাইরে বদলির নির্দেশ দেন গভর্নর।
এই বদলির আদেশ বাতিলের দাবিতে ‘অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল’ ব্যানারে প্রতিবাদ সভা হয়। প্রতিবাদকারীরা বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত। উত্তেজনার মধ্যে গভর্নর সংবাদ সম্মেলন করে একটি ‘কুচক্রী মহলের’ ইন্ধনের অভিযোগ তোলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি কার্যালয় ত্যাগ করেন।
এরপর সরকার তাকে সরিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। খবর ছড়িয়ে পড়তেই কয়েকজন কর্মকর্তা গভর্নরের পিএস ও অতিরিক্ত পরিচালক কামরুল ইসলামকে জোর করে বের করে দেন। একইভাবে সাবেক উপদেষ্টা আহসান উল্লাহ ও নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ফারুক হাওলাদারকেও বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, আহসান উল্লাহকে ধাক্কা দিতে দিতে বের করে দেওয়া হচ্ছে। গাড়িতে ওঠার সময় তাকে ঘিরে অশালীন ভাষা ব্যবহার এবং বাধা দেওয়ার দৃশ্যও দেখা যায়। পরে ব্যাংকের দুই নির্বাহী পরিচালক ও নিরাপত্তাকর্মীদের সহায়তায় তিনি স্থান ত্যাগ করেন। এসব ঘটনাকে ‘মব’ সৃষ্টির মাধ্যমে সংঘটিত দলবদ্ধ বিশৃঙ্খলা বলে অভিযোগ উঠেছে।
নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন কর্মকর্তার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তবে কামরুল ইসলামকে সদরঘাট শাখায় বদলি করা হয়েছে।
বরিশাল আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্ট
বরিশালে আদালতের এজলাসে হট্টগোলের ঘটনায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আদালত অবমাননার অভিযোগে হাইকোর্ট রুল জারি করেছে এবং ১০ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের কক্ষে হা’\মলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। মানববন্ধনের প্রতিবাদ ঘিরেই এ ঘটনা ঘটে বলে জানা যায়। বিএনপিপন্থী জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও তারা তা অস্বীকার করেছেন।
বাসসে অস্থিরতা
নতুন সরকারের শপথের পরদিন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব মোর্শেদকে কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তার বিরুদ্ধে অপেশাদার আচরণ ও একনায়কতান্ত্রিক পরিচালনার অভিযোগ তোলেন বিক্ষুব্ধ কর্মীরা। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন—অফিসে মব সৃষ্টি করে হা’\মলা চালিয়ে তাকে সরানো হলো কেন? একইসঙ্গে বিএনপিকে দায়ী করেন, যা দলটি অস্বীকার করেছে।
‘দ্রুত আইনি পদক্ষেপই বার্তা দেবে’
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে কাউকে পদত্যাগে বাধ্য করা বা অপদস্থ করা—যেভাবেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, তা মবের সংজ্ঞার মধ্যেই পড়ে। ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, বরিশাল আদালতের ঘটনায় যেভাবে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা একটি বার্তা। একই ধরনের কঠোরতা অন্য ক্ষেত্রেও দেখাতে হবে, নইলে ‘মব’ সংস্কৃতি রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রূপ বদলে ফিরে আসবে।
