তুর্কি সংবাদ বিশ্লেষক হাক্কি ওজালের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব এখন এক অদৃশ্য সুতোয় ঝুলছে—আর সেই সুতোর নাম ইরান যুদ্ধ। তার দাবি, এই সংঘাত কেবল ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নয়; বরং দুই নেতার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক টিকে থাকার কৌশলের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
ওজাল অভিযোগ করেন, নিজেদের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পেতে একটি ‘কাল্পনিক শত্রু’ দাঁড় করিয়ে যুদ্ধের আবহ তৈরি করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অন্দরে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন ছড়িয়েছে—ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো নিজের অভিশংসন ঠেকাতে এবং সামনে আসা মধ্যবর্তী নির্বাচন স্থগিত করার পথ খুঁজছেন। তার ঘনিষ্ঠ মহলে জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে নির্বাচনের ওপর প্রেসিডেন্টের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নির্বাহী আদেশের খসড়া প্রস্তুতের কথাও শোনা যাচ্ছে।
অন্যদিকে, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বর্তমানে ঘুষ ও দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত। বিশ্লেষকের ভাষ্য অনুযায়ী, তার জন্য একটি যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। গাজা যুদ্ধ সেই সুযোগ তৈরি করলেও, ট্রাম্পের শান্তি চুক্তির উদ্যোগে তা ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছিল। ফলে উভয়ের স্বার্থেই এমন এক বৃহৎ সংকট প্রয়োজন হয়ে পড়ে, যা একজনকে নির্বাচন বাতিলের যুক্তি দেবে এবং অন্যজনকে আদালতের কাঠগড়া থেকে দূরে রাখবে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ইরান পারমাণবিক সক্ষমতার খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে—নেতানিয়াহুর তিন দশকের পুরনো এই দাবিকেই ট্রাম্প এখন রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। অথচ এই দাবির সত্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
সমাজবিজ্ঞানী জঁ বদরিলার-এর ‘সিমুলেশন’ তত্ত্ব টেনে এনে ওজাল বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন এমন এক ভীতিকর বাস্তবতার ছবি আঁকছে, যার অস্তিত্ব বাস্তবে স্পষ্ট নয়। ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার যে আশঙ্কা তুলে ধরা হচ্ছে, সেটিকে তিনি রাজনৈতিক গেম বা কৃত্রিম বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন—এক ধরনের ‘হাইপার-রিয়ালিটি’, যা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের পথ প্রশস্ত করে।
এই নির্মিত সংকটের সুযোগ নিয়ে ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন বাতিল করে ক্ষমতার পথ নিষ্কণ্টক করার চেষ্টা করছেন—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না বলে মত বিশ্লেষকদের। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই মার্কিন সমাজে পড়তে শুরু করেছে। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর এই প্রথমবারের মতো দেশটিতে অভিবাসীর চেয়ে দেশত্যাগী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই তথাকথিত ‘জরুরি অবস্থা’ টিকিয়ে রাখতে বহু নিরীহ বেসামরিক মানুষের জীবন এবং মার্কিন সেনাদের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। যেখানে জেনেভায় পরোক্ষ আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতার সম্ভাবনা ছিল বলেই ধারণা করা হচ্ছিল, সেখানে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ওজালের ভাষায়, ডিজনি ল্যান্ড যেমন একটি কৃত্রিম জগৎ—দেখতে বাস্তব, কিন্তু প্রকৃত অর্থে নির্মিত—ট্রাম্প প্রশাসনের তৈরি এই হুমকির চিত্রও তেমনই এক অলীক কল্পনা। তবে এই সাজানো বাস্তবতার আড়ালে যে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মানুষ প্রা’\ণ হা’\রাচ্ছে, সেই রূঢ় সত্য কোনোভাবেই অস্বীকার করার নয়।


