১৯৯৬ সালে যে চেয়ারে দায়িত্ব শেষ করে বিদায় নিয়েছিলেন বাবা, ঠিক ৩০ বছর পর সেই একই চেয়ারে বসলেন তারই মেয়ে। ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক নিয়োগ নয়—এ যেন রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রতীকী পুনরাবৃত্তি। আলোচনায় এখন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুল।
তিন দশক আগে এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন তার বাবা ফজলুর রহমান (পটল)। বড় ভাইয়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াই পেরিয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বাবার ছেড়ে যাওয়া সেই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বই পেয়েছেন পুতুল। ফলে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইতিহাস যেন এসে মিলেছে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায়।
ফারজানা শারমিনের জন্ম ১৯৮৪ সালের নভেম্বরে। তিনি নাটোর-১ আসনের চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি লালপুর উপজেলার গৌরীপুর গ্রামে। ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ফজলুর রহমান বেগম খালেদা জিয়া (Begum Khaleda Zia)-র নেতৃত্বাধীন সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। পরে ১৯৯৩ সালে তাকে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১১ দিনের সরকারেও তিনি একই মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তবে মাত্র দশ দিনের মাথায়, ৩০ মার্চ ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাদের সরকারকে।
১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ বাবার ছেড়ে যাওয়া সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর সেই দায়িত্বই ৩০ বছর পর, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি গ্রহণ করেছেন ফারজানা শারমিন পুতুল। সমাজকল্যাণের পাশাপাশি তাকে দেওয়া হয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও। একসঙ্গে দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে—প্রথমবারের এমপি হয়েই এমন দায়িত্ব, নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
শিক্ষাজীবনে ফারজানা শারমিন পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর আইন বিভাগে। পরে তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় (University of London) এবং বিপিপি ইউনিভার্সিটি কলেজ, লন্ডন থেকে। দেশে ফিরে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ জেলা আদালতে অ্যাডভোকেট হিসেবে আইনজীবী জীবন শুরু করেন। ২০১২ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইনচর্চার অনুমতি লাভ করেন। আইন ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার এই সমন্বয় তার রাজনৈতিক পরিচয়ে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ সালে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের সদস্য করা হয় তাকে। প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও শুরুতে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না ফারজানা শারমিন পুতুল। ২০১৬ সালে বাবা ফজলুর রহমানের মৃত্যুর পর থেকে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে নাটোর জেলা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-এর যুগ্ম আহ্বায়ক মনোনীত হন। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির বিশেষ সহকারীদের একজন। পাশাপাশি দলটির মানবাধিকার কমিটি ও মিডিয়া সেল কমিটিতেও কাজ করেছেন।
এবার নাটোর-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ফারজানা শারমিন। তবে এই পথ তার জন্য মোটেই সহজ ছিল না। জামায়াতের প্রার্থী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর পাশাপাশি তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নিজ ভাই ইয়াসির আরশাদও। যদিও এক পর্যায়ে ভাই মাঠ ছেড়ে দেন, তবুও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-র প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ এবং নিজ দলের বহিষ্কৃত নেতা তাইফুল ইসলামের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে ১২ হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন তিনি।
প্রথমবার এমপি হয়েই দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক তাৎপর্যপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—তার হাত ধরে শুধু এলাকার উন্নয়নই নয়, সারাদেশে নতুনভাবে উচ্চারিত হবে নাটোরের নামও।
