দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও পরিবর্তনের পর অনেকের কাছে যেন এক নতুন বাংলাদেশের সূচনার ইঙ্গিত মিলছে। নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ সামনে আনছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। দেশের মাটিতে ফিরে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ ঘোষণা করার পর থেকেই বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন দিগন্তের কথা বলছেন তিনি। অনেকেই মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানো তারেক রহমানের জীবনগাথাও নানা ঘটনার সাক্ষী। একসময় বিনা ওয়ারেন্টে বাসা থেকে তুলে নেওয়া, তার ওপর হামলার পরিকল্পনা এবং মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার পর বিদেশে চিকিৎসার জন্য দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়া—এসব ঘটনার পর অনেকেই ধারণা করেননি যে ভবিষ্যতে তার হাত ধরেই দেশের নেতৃত্বে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
শপথ গ্রহণের প্রথম দিনেই তিনি একটি আলোচিত ঘোষণা দেন—বিএনপির কোনো সংসদ সদস্য শুল্কমুক্ত গাড়ি বা সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। এরপর ধারাবাহিকভাবে কিছু সিদ্ধান্ত সামনে আসে, যেগুলো অনেকের কাছে নজিরবিহীন বলে মনে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে বদলে যাওয়া দৃশ্য
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াত মানেই ছিলো ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, দীর্ঘ যানজট এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর যাওয়ার আগে অনেক সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হতো। সড়কের দুই পাশে অবস্থান নিতেন পুলিশ সদস্যরা, আর পথচারীদেরও অনেক সময় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো।
এই প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে উদ্যোগ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতে অতিরিক্ত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে আনা হয়েছে। ফলে অনেক সময় দেখা যাচ্ছে, সাধারণ যানবাহনের মাঝেই প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর চলাচল করছে।
এতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক ধরনের সরাসরি যোগাযোগের দৃশ্যও দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির সঙ্গে ছবি তুলছেন, কেউ হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
রাজধানীর বাংলামোটর এলাকায় দাঁড়িয়ে থাকা শেখ মতলু নামের এক ব্যক্তি বলেন, “হঠাৎ দেখি পাশ দিয়ে হাসিমুখে হাত নাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন। আমিও হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালাম। এমন দৃশ্য আগে কল্পনাও করিনি।”
আরেক পথচারী বলেন, বিদেশে অনেক সময় সাধারণ মানুষের মাঝে নেতাদের দেখা যায়। তিনি উল্লেখ করেন জাস্টিন পিয়ের জেমস ট্রুডো (Justin Pierre James Trudeau)-এর উদাহরণ। তার ভাষায়, “আগে ভাবতাম আমাদের দেশেও যদি এমন একজন প্রধানমন্ত্রী থাকতেন। এখন মনে হচ্ছে আমরা তেমন একজন নেতাই পেয়েছি।”
রাজনৈতিক সম্পর্কেও ভিন্ন বার্তা
নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সৌজন্যের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর মধ্যে রয়েছে ডা. শফিকুর রহমান (Dr. Shafiqur Rahman), নাহিদ ইসলাম (Nahid Islam) এবং মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম (Mufti Syed Muhammad Rezaul Karim)-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি ভিন্ন বার্তা বহন করে। কেউ কেউ এটিকে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে সহনশীলতা ও সম্প্রীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
একই ধারাবাহিকতায় গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যা অনেকের মতে সংসদীয় ব্যবস্থায় ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে।
উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সামাজিক উদ্যোগ
সরকার গঠনের পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বেশ কিছু কর্মসূচির কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলাশয় পুনঃখনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি বড় পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা আগামী ১৬ মার্চ দিনাজপুরের কাহারোল থেকে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু পরিবর্তন
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রশাসন ও বিভিন্ন বাহিনীতে পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পালন করা দক্ষ কর্মকর্তাদেরও প্রশাসনে রাখা হয়েছে।
এদিকে সরকারি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা বন্ধ, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর কমানো এবং রমজানে ব্যয়বহুল ইফতার আয়োজন পরিহারের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরও কমিয়ে আনা হয়েছে বলে জানা গেছে। আগে যেখানে দীর্ঘ গাড়িবহর চলাচল করতো, এখন সেটি কমিয়ে সীমিত সংখ্যক গাড়িতে রাখা হয়েছে।
নতুন বাস্তবতা নাকি প্রত্যাশার শুরু
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের এসব পদক্ষেপকে অনেকেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তবে এসব উদ্যোগ কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই ভবিষ্যতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তাদের মতে, যদি এসব নীতি ও উদ্যোগ বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে দেশের রাজনীতি ও প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।


