প্রায় সাড়ে ১৯ মাস পর আবারও বসছে জাতীয় সংসদ। আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। তবে এটি শুরু হচ্ছে এক ব্যতিক্রমী প্রেক্ষাপটে—বিদায়ী দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর কারাবন্দি অবস্থার কারণে শুরুতেই স্পিকারের চেয়ার খালি রেখেই অধিবেশন শুরু হবে।
সংসদের কার্যক্রম শুরু হবে পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। এরপর সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্বের জন্য বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন। দলের আরেকজন সংসদ সদস্য সেটিকে সমর্থন করলে ওই জ্যেষ্ঠ সদস্য অস্থায়ীভাবে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলের জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন (Khandaker Mosharraf Hossain) প্রথম বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে পারেন। বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (Hafiz Uddin Ahmed)-এর নামও। সভাপতির আসন গ্রহণের পরপরই সংসদে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
গতকাল সংসদ ভবনে সরকারি দল বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সম্ভাব্য নাম প্রকাশ করা হয়নি। বৈঠকে উপস্থিত এমপিরা এই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়নের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দেন।
সংবিধান অনুযায়ী আজ সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (Mohammad Shahabuddin)। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ভাষণই তিনি সংসদে পাঠ করবেন। তবে বিরোধী দল জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ কয়েকটি দল রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। ভাষণ শুরুর সময় তারা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করতে পারেন, পরে আবার অধিবেশনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সঙ্গে ‘জুলাই সনদ’ ইস্যু ঘিরেও প্রথম দিন থেকেই সংসদে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংবিধানের ৭২ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা বাধ্যতামূলক। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি। সেই হিসেবে ১৬ মার্চের মধ্যে অধিবেশন ডাকার সাংবিধানিক সময়সীমা ছিল। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে তার চারদিন আগেই আজ সংসদের অধিবেশন শুরু হচ্ছে।
সর্বশেষ জাতীয় সংসদ বসেছিল ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। সেটি ছিল দ্বাদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষদিন এবং একই সঙ্গে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন। ওই বছরের ৫ জুন শুরু হয়ে ১৯ কার্যদিবস শেষে ৩ জুলাই অধিবেশন শেষ হয়েছিল। এরপর জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। দীর্ঘ সময় পর এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে আবার সংসদ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।
আজকের অধিবেশনে গ্যালারিতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ নাফিজকে হাসপাতালে নেওয়া সেই রিকশাচালক। গুলিবিদ্ধ নাফিজকে রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়ার সেই ছবি আন্দোলনের সময় ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। এছাড়া আন্দোলনে শহিদ হওয়া আরও চারটি পরিবারের সদস্যরাও সংসদ গ্যালারিতে বসে অধিবেশন পর্যবেক্ষণ করবেন।
অধিবেশন শুরুর আগে গতকাল সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (Mirza Fakhrul Islam Alamgir) বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, অনেকেই এই কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কিন্তু ভোটের আঙুলের কালি শুকানোর আগেই সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তিনি জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচিও শুরু করা হবে। ডেঙ্গু মৌসুম সামনে রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করারও নির্দেশনা দেন তিনি।
এদিকে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকেও সংসদ অধিবেশন নিয়ে সক্রিয় প্রস্তুতি দেখা গেছে। জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান (Shafiqur Rahman) বলেন, তারা একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান। দেশ ও জাতির স্বার্থে ভালো সিদ্ধান্তে তারা সহযোগিতা করবেন, তবে ক্ষতিকর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করবেন।
চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশও সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এসব অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হবে, যেখানে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন।
