জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ভাষণ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন। পরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান (Shafiqur Rahman)।
বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দীন (Mohammad Shahabuddin) ভাষণ শুরু করলে বিরোধীদলীয় সদস্যরা প্লাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানান। পরে তারা সম্মিলিতভাবে সংসদ কক্ষ থেকে বের হয়ে যান।
প্রেস ব্রিফিংয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বহু প্রত্যাশার একটি নির্বাচন হয়েছে। তবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে তারা এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে চান না। তিনি বলেন, বুকভরা আশা নিয়ে তারা সংসদে এসেছেন—কারণ এই সংসদ জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেই কারণেই তারা আগে থেকেই অনুরোধ করেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে কিংবা যারা খু’\ন\ের সহযোগী ছিলেন, তাদের যেন সংসদে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়।
বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করে বলেন, রাষ্ট্রপতি তিনটি কারণে গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, তার আমলে সংঘটিত বহু খু’\ন\ের ঘটনায় তিনি কোনো প্রতিবাদ জানাননি বা কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। একজন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার দায়িত্ব ছিল—কিন্তু সে দায়িত্ব পালনে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়টি। সে সময় রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন, ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে সেই বক্তব্য থেকে সরে এসে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। এতে করে রাষ্ট্রপতি জাতির সামনে অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তৃতীয় অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতি একটি অর্ডিন্যান্সে স্বাক্ষর করেন, যেখানে উল্লেখ ছিল—ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের নির্বাচনে যারা নির্বাচিত হবেন তারা একই সঙ্গে সংস্কার পরিষদের সদস্য এবং সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একই দিনে একই ব্যক্তি তাদের উভয় শপথ পড়াবেন। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির ছিল। কিন্তু তিনি সেই অধিবেশন ডাকেননি। অথচ গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই তিনটি কারণে তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে চাননি। তারা সরকার ও স্পিকারকেও অনুরোধ করেছিলেন যাতে রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়। কিন্তু সেই অনুরোধ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধীদলীয় সদস্যরা সংসদ ত্যাগ করেন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সংসদে কোনো অন্যায় বরদাশত করা হবে না। জনগণের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় বিরোধীদল সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংগ্রাম চালিয়ে যাবে।
দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের অধিকারের পক্ষে আছি। আপনাদের রায়ের প্রতি আমাদের সম্মান আছে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি, আপনারাও আমাদের সঙ্গে থাকবেন।”
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত প্রায় দেড় বছর ধরে তারা নীতিগতভাবে রাষ্ট্রপতির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বিভিন্ন সময় তাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এই সংসদ কোনো ব্যক্তি বা দলের একার নয়—এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের সংসদ। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই তারা সংসদে উপস্থিত থাকবেন এবং জনগণের অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন।
এর আগে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরু হওয়ার আগে বিরোধীদলীয় সদস্যরা প্লাকার্ড হাতে ফ্যাসিস্টবিরোধী শ্লোগান দিতে থাকেন। প্লাকার্ডে লেখা ছিল—“জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি জনগণ সইবে না।” এ সময় মাইক ছাড়াই রাষ্ট্রপতি বিরোধী বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের (Syed Abdullah Mohammad Taher)ও মাইক ছাড়া বক্তব্য দিয়ে বলেন, সংসদ একটি পবিত্র জায়গা—এখানে ফ্যাসিস্টদের কোনো স্থান হতে পারে না।
এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপির সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম (Nahid Islam) ও হাসনাত আব্দুল্লাহ (Hasnat Abdullah) রাষ্ট্রপতি বিরোধী বক্তব্য দেন।
অন্য সংসদ সদস্যরা তখন বিভিন্ন শ্লোগান দিতে থাকেন—“কিলার চুপ্পু, হেট হেট”, “ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র একসাথে চলে না”, “চুপ্পুকে গ্রেপ্তার করতে হবে” ইত্যাদি শ্লোগানে সংসদ ভবনের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
