উত্তরের মানুষের ঈদযাত্রা ঘিরে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে টাঙ্গাইল-ঢাকা-যমুনা সেতু মহাসড়কের সেই বহুল আলোচিত ১৩ কিলোমিটার পথ। মহাসড়ক উন্নীতকরণের কাজ দীর্ঘদিন ধরে শেষ না হওয়ায় গত তিন বছর ধরেই ঈদের সময় এই অংশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় দূরপাল্লার যাত্রীদের। এবারের ঈদযাত্রায় সেই পুরোনো সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলেঙ্গায় নির্মাণাধীন ফ্লাইওভার। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ১৩ কিলোমিটার সড়কের পাশাপাশি এলেঙ্গার ফ্লাইওভারও এবার ঈদযাত্রায় নতুন করে গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে।
জানা গেছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের জয়দেবপুর থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে এই অংশ দিয়ে উত্তরবঙ্গসহ ২৪টি জেলার মানুষ এখন তুলনামূলক নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছে। কিন্তু দফায় দফায় সময় বাড়ানো হলেও এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু (Jamuna Bridge) পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার সড়কের কাজ এখনো শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ধীরগতি, এলেঙ্গায় ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ, অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং সেতু পারাপারের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এবারের ঈদযাত্রা ঘিরে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে এলেঙ্গা এলাকায় ফ্লাইওভার ও আন্ডারপাস নির্মাণকাজ একসঙ্গে চলছে। কিন্তু সড়কের লেনসহ মহাসড়কের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়নকাজ এখনো শেষ হয়নি। নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রায়ই যানজট তৈরি হচ্ছে। আর ঈদের সময় যখন যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মহাসড়কে আটকে থাকতে হয় দূরপাল্লার যাত্রীদের।
সরেজমিনে দেখা গেছে, এলেঙ্গা এলাকায় ফ্লাইওভারের নির্মাণকাজ জোরেশোরে চলছে। একই সঙ্গে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে আন্ডারপাস নির্মাণকাজও অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোথাও সড়কের মাঝখানে বালুর স্তূপ জমা করে রাখা হয়েছে, যা যান চলাচলে বাড়তি ঝুঁকি ও ধীরগতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্মাণশ্রমিকরা জানান, প্রায় ছয় মাস ধরে এলেঙ্গা ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। দ্রুত প্রকল্প শেষ করার নির্দেশনা থাকায় দিন-রাত কাজ করতে হচ্ছে তাদের। তবে নির্মাণকাজ চলাকালীন মহাসড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উত্তরবঙ্গগামী হানিফ পরিবহন (Hanif Paribahan)-এর চালক হেলাল মিয়া বলেন, গত কয়েক বছর ধরেই এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়কের উন্নয়নকাজ চলছে। এর ফলে মাঝেমধ্যে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। তিনি বলেন, “ঈদ এলেই হঠাৎ করে কাজের গতি বাড়ানো হয়। আবার ঈদ শেষ হলেই নির্মাণকাজ অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে।”
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে যমুনা সেতু (Jamuna Bridge) উদ্বোধনের মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তখন সেতুর ওপর দিয়ে দৈনিক প্রায় ১২ হাজার যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা ছিল। শুরুতে সেতুর দুই প্রান্তে চারটি বুথ দিয়ে অন্তত দুই হাজার যানবাহন পারাপার হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে মোট ১৪টি বুথ দিয়ে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২২ হাজারের বেশি যানবাহন পারাপার হচ্ছে। আর ঈদের সময় সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজারে। ফলে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট তৈরি হওয়া এখন প্রায় নিয়মিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
মহাসড়ক উন্নয়নকাজে ধীরগতি ও জনভোগান্তির বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনায়েম লিমিটেড (Abdul Monem Limited)-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক রবিউল আওয়াল (Robiul Awal) বলেন, প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আরও এক বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রা সামনে রেখে মহাসড়কের উত্তরবঙ্গগামী সার্ভিস লেন খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে টাঙ্গাইল পুলিশ (Tangail Police) জানিয়েছে, ইতোমধ্যে মহাসড়ক দিয়ে উত্তরের জেলাগুলোর মানুষ ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে। তবে ১৬ মার্চ থেকে গাড়ির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর ১৭ ও ১৮ মার্চ মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়তে পারে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ঈদে মহাসড়কে বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ডা’\কা’\তি’\র ঘটনা ঘটেছিল। ফলে এবারের ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেও বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার শামসুল আলম সরকার (Shamsul Alam Sarkar) জানিয়েছেন, ঈদে মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারে, সে জন্য মহাসড়কে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন। ফিটনেসবিহীন কোনো যানবাহন সড়কে চলতে দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে সম্ভাব্য ডা’\কা’\তি প্রতিরোধে মহাসড়কে পুলিশ টহলও জোরদার করা হয়েছে।
