পবিত্র রমজান মাসে দেশের বিভিন্ন মসজিদে মুসল্লিরা ইতিকাফে বসেন। তবে এবারের রমজানে যশোরের একটি মসজিদে ইতিকাফ আয়োজন যেন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। সেখানে বড় পরিসরে ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ মুসল্লি, যাদের মধ্যে রয়েছেন ৭৫ জন বিদেশি নাগরিক। এসব বিদেশি মুসল্লি এসেছেন ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, যুক্তরাষ্ট্র এবং পানামা থেকে।
জানা গেছে, আশরাফুল মাদারিস (Ashraful Madaris) কম্পাউন্ডের মসজিদটি অবস্থিত যশোর সদর উপজেলা (Jessore Sadar Upazila)-এর রামনগর ইউনিয়নের সতীঘাটা এলাকায়। এখানেই এবারের রমজানে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন। সাধারণত ২০ রমজান থেকে সুন্নত ইতিকাফ শুরু হলেও এই মসজিদে ১ রমজান থেকেই অনেক মুসল্লি নফল ইতিকাফে বসে পড়েন। রোজা যত এগিয়েছে, মুসল্লির সংখ্যাও তত বেড়েছে। ২২ রমজান পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, সুন্নত ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৬০০ মুসল্লি।
মাদরাসাটির মহাপরিচালক মাওলানা নাসীরুল্লাহ (Maulana Nasirullah) জানান, তাদের মসজিদে কয়েক বছর ধরেই বড় পরিসরে ইতিকাফ আয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো এখানে বৃহৎ পরিসরে ইতিকাফের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর থেকে দেশ-বিদেশের মুসল্লিদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। এর আগে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়া এবং যশোরের মাছনা মাদরাসাসংলগ্ন মসজিদেও বড় পরিসরে এমন ইতিকাফ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশাল কম্পাউন্ডের ভেতরে চারতলাবিশিষ্ট প্রশস্ত একটি মসজিদে একসঙ্গে সহস্রাধিক মুসল্লি ইতিকাফে অংশ নিতে পারছেন। মুসল্লিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। ইফতার, রাতের খাবার ও সাহরির আয়োজন করা হচ্ছে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। মাদরাসার শিক্ষক, কর্মচারী এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাসচিব হাফেজ মাওলানা সাব্বির আহমাদ (Hafiz Maulana Sabbir Ahmad) জানান, শায়খুল হাদিস মাহমুদুল হাসান গাঙ্গুহি (Mahmudul Hasan Gangohi)-এর সিলসিলার অনুসারীরাই মূলত এখানে ইতিকাফে অংশ নেন। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক শায়খ ইব্রাহিম আফ্রিকি (Ibrahim Afriki) এই সিলসিলার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। তিনি যেখানে অবস্থান করেন, তার অনুসারীরাও দেশ-বিদেশ থেকে সেখানে সমবেত হন। এবারের রমজানে তিনি যশোরে অবস্থান করায় দেশ-বিদেশের বহু আলেম ও অনুসারী এখানে এসে ইতিকাফে অংশ নিয়েছেন।
ইতিকাফ চলাকালে নামাজের আগে দেশ-বিদেশের আলেমরা মুসল্লিদের উদ্দেশে নসিহত পেশ করছেন। বিভিন্ন ভাষায় দেওয়া বক্তব্য এবং জুমার খুতবা মুসল্লিদের বোঝার সুবিধার্থে বাংলায় অনুবাদ করে শোনানো হচ্ছে।
স্থানীয় আলেমরা জানান, বিপুলসংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতি সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ সুষ্ঠুভাবে ইতিকাফের পরিবেশ বজায় রাখতে নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিদেশি মুসল্লিদের জন্য তাদের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী আলাদা খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আশরাফুল মাদারিস প্রাঙ্গণে কথা হয় যশোর শহরের নলডাঙ্গা জামে মসজিদের খতিব মুফতি আরিফুল ইসলাম ফয়সালের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাংলাদেশি মুসল্লিদের জন্য যে ধরনের খাবারের আয়োজন করা হয়, বিদেশি মুসল্লিরা অনেক সময় তা খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। তাই সংশ্লিষ্ট দেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী খাবার প্রস্তুতের চেষ্টা করা হয়।
এদিকে যশোর শহরের দড়াটানা মসজিদের খতিব এবং দড়াটানা মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি আমানুল্লাহ কাসেমী এবার সুন্নত ইতিকাফে বসেছেন এখানেই। তিনি বলেন, ইতিকাফে থাকা মুসল্লিদের খেদমতে যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে এখানকার খানকায়ে মাহমুদিয়ার ব্যবস্থাপনায়। মুসল্লিরা মূলত আল্লাহমুখী হওয়ার উদ্দেশ্যেই ইতিকাফে বসেন। সেই উপযোগী পরিবেশ থাকায়ই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মুসল্লি এখানে এসে ইতিকাফে অংশ নিচ্ছেন।


