ঈদ সামনে এলেই ব্যস্ততা বাড়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের রাজধানীতে যাতায়াতের প্রধান প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠা এই সড়কে এখন ঘরমুখী মানুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এই বাড়তি যাত্রীচাপকে পুঁজি করে পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে, যা ঈদে বাড়ি ফেরা সাধারণ মানুষের জন্য নতুন করে দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। দ্রুতগামী এই এক্সপ্রেসওয়ে মানুষের যাতায়াতে নতুন গতি এনে দিলেও ভাড়ার বিড়ম্বনা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। বিশেষ করে ঈদকে কেন্দ্র করে দূরপাল্লার পাশাপাশি লোকাল পরিবহনেও ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণ এমনকি তিন গুণ পর্যন্ত হয়ে যায় বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পাঁচ্চর গোলচত্বরে বাসভাড়ার একটি তালিকা টানানো হয়েছে, যেখানে শিবচর থেকে ঢাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যাত্রীরা বলছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি ছাড়া ঈদ মৌসুমে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
জানা গেছে, পদ্মা সেতু (Padma Bridge) চালুর পর সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন এসেছে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। তবে সেতু চালুর পরও এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার যাত্রীদের ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি।
বিশেষ করে মাদারীপুর (Madaripur) জেলার শিবচর এলাকার যাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ করে আসছেন। ভাঙ্গা থেকে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও গুলিস্তান রুটে সাধারণত লোকাল পরিবহন চলাচল করে। দীর্ঘদিন ধরে শিবচরের পাঁচ্চর স্ট্যান্ড থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। তবে সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে এই ভাড়া কমিয়ে ১৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, ফরিদপুর (Faridpur) জেলার ভাঙ্গা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ঢাকায় যাওয়া-আসা করেন। ভাঙ্গা থেকে ছেড়ে আসা লোকাল পরিবহনগুলো এক্সপ্রেসওয়ের বিভিন্ন স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা করায়। ভাঙ্গা থেকে ঢাকার গুলিস্তান পর্যন্ত যাত্রীপ্রতি ভাড়া ২০০ টাকা হলেও মাত্র ১০–১২ কিলোমিটার পরে শিবচরের সূর্যনগর ও পাঁচ্চর থেকেও এতদিন একই ভাড়া নেওয়া হতো। এই বিষয়টি নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে বাস চালক ও সংশ্লিষ্টদের বাগ্বিতণ্ডাও প্রায়ই ঘটত।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ের সূর্যনগর ও পাঁচ্চরসহ বিভিন্ন স্টপেজ থেকে যাত্রী তুললেই বাস সংশ্লিষ্টদের ২০ টাকা করে চাঁদা দিতে হতো। স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এই চাঁদা আদায় করা হতো বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে এর প্রভাব পড়ত যাত্রীদের ওপর, কারণ বাড়তি ভাড়া দিয়েই ঢাকায় যেতে বাধ্য হতেন তারা। ঈদ মৌসুমে এই ভাড়া আবার দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায় বলেও জানা গেছে।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে পাঁচ্চর থেকে ঢাকার ভাড়া ছিল ২০০ টাকা। বর্তমানে তা কমিয়ে ১৭০ টাকা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পাঁচ্চরে ভাড়ার তালিকাও টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকাগামী লোকাল পরিবহনের চালক রবিউল ইসলাম বলেন, ব্রিজের টোল ও জ্বালানির দাম তো কমেনি, অথচ যাত্রীদের ভাড়া কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রহমান মিয়া নামের এক যাত্রী বলেন, কয়েকদিন ধরে ভাড়া ৩০ টাকা কমানো হয়েছে। এটি লোকাল পরিবহনের ভাড়া। দূরপাল্লার পরিবহনে এখনো ২০০ টাকাই নেওয়া হয়। তবে ঈদের সময় এই নিয়ম কতটা মানা হবে সেটাই বড় প্রশ্ন। কারণ বাড়তি ভাড়ার প্রতিবাদ করলে অনেক সময় যাত্রীদের হেনস্তার শিকার হতে হয়।
আরেক যাত্রী মো. রনি মিয়া বলেন, বর্তমানে কিছুটা ভাড়া কমানো হয়েছে। আমাদের নতুন সংসদ সদস্য বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। তিনি কয়েকবার বাসস্ট্যান্ড পরিদর্শন করেছেন। এখন ভাড়ার তালিকাও টানানো হয়েছে। তবে ঈদের সময় অতিরিক্ত ভাড়া বন্ধ রাখা বড় চ্যালেঞ্জ।
মাদারীপুর-১ শিবচর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা (Said Uddin Ahmed Hanjala) বলেন, শিবচর থেকে ঢাকায় যাওয়া যাত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে জুলুমের শিকার হচ্ছেন। মহাসড়কের সূর্যনগর ও পাঁচ্চর এলাকায় পরিবহনে চাঁদাবাজির কারণে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হতো। চাঁদাবাজি বন্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি। এ রুটে বাস চালকদের বলা হয়েছে, কোনো স্ট্যান্ডে চাঁদা দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি বাসমালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে ভাড়াও কমানো হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশ (Bangladesh Highway Police) জানিয়েছে, মহাসড়কে দুর্ঘটনা এড়ানো ও যেকোনো বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে তাদের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। শিবচর হাইওয়ে থানার ওসি জহুরুল ইসলাম বলেন, ঈদে যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে বাড়তি টহলের ব্যবস্থা থাকবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা এড়াতে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণেও সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হবে।

