ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র বিপ্লবী শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদিকে হারানোর শোক এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশের মানুষ। শারীরিকভাবে তিনি আর নেই—তবু অমর একুশে বইমেলায় পাঠকের ভিড়ের মধ্যে যেন বারবার ফিরে আসছেন তিনি। লেখক পরিচয়ে ছদ্মনাম ‘সীমান্ত শরীফ’ ব্যবহার করে লেখা তার বইগুলো এখন পাঠকের হাতে হাতে ঘুরছে, আর তার স্মৃতিকে নতুন করে সামনে এনে দিচ্ছে।
এবারের বইমেলায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা পাঠকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোঁজ পড়ছে তার আলোচিত বই ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’-এর। পাশাপাশি পাঠকেরা সংগ্রহ করছেন ‘জুলাইয়ের গ্রাফিতি ও গাইল সমগ্র’সহ তার লেখা ও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার (Inqilab Cultural Center) থেকে প্রকাশিত অন্যান্য বইও।
পাঠকদের মতে, হাদির লেখায় যেমন রয়েছে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ভাষা, তেমনি আছে দেশ ও মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। ফলে তাকে হারানোর পর তার লেখা বইগুলোর প্রতি আগ্রহ যেন আরও বেড়েছে।
গত ১২ ডিসেম্বর সন্ত্রাসীদের গু’\লি’\তে গুরুতর আ’\হত হন শরীফ ওসমান বিন হাদি। প্রাথমিক চিকিৎসার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শা’\হা’\দত বরণ করেন। তার শা’\হা’\দতের পর থেকেই তার লেখালেখি, ভাবনা ও আদর্শ নিয়ে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে তরুণদের মধ্যে।
মুন্সীগঞ্জ (Munshiganj) থেকে বইমেলায় আসা আজিজুল হক জানান, তিনি মেলায় এসে ‘জুলাই বয়ান’সহ কয়েকটি বই কিনেছেন। পাশাপাশি সংগ্রহ করেছেন শহীদ হাদির কবিতার বই। তার ভাষায়, হাদি ভাইয়ের কথা ও লেখার ভেতরে যে প্রতিবাদের শক্তি আছে, তা তরুণদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।
পুরান ঢাকার বংশাল থেকে আসা ১০ বছরের শিশু আবদুল্লাহ ফয়সাল ছোটদের জন্য লেখা ‘ছোটদের ওসমান হাদি’ বইটি কিনেছে। সঙ্গে নিয়েছে ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’। ফয়সালের ভাষায়, হাদি ভাইকে সে মোবাইল ফোনের বিভিন্ন ভিডিওতে দেখেছে। আজ ভাইয়ের বই হাতে পেয়ে সে বলল, “ভাইকে খুব ভালো লাগে, তাই ভাইয়ের বই নিলাম।”
গাজীপুর (Gazipur) থেকে বাবা তাজউদ্দীন ও মা সালমা খানমের সঙ্গে মেলায় এসেছে তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল সা’দ। সে জানায়, বই পড়তে তার খুব ভালো লাগে। তাই মেলায় এসে অনেক বই কিনেছে, যার মধ্যে শহীদ হাদির বইও রয়েছে। তার কথায়, আমাদের হাদি ভাইয়ের লড়াই সম্পর্কে জানা উচিত—সেই কারণেই সে তার বই সংগ্রহ করেছে।
শেওড়াপাড়া থেকে জুহাইর রনির সঙ্গে মেলায় এসেছেন নুসরাত জাহান জেবা। মেলায় ঢুকেই তিনি প্রথমে সংগ্রহ করেন ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’। নুসরাতের মতে, হাদির সাংস্কৃতিক লড়াই এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম জানতে হলে প্রকৃত ইতিহাসভিত্তিক বই পড়া জরুরি—আর সেই তালিকায় হাদিদের বই থাকা উচিত।
নেত্রকোনা (Netrokona) থেকে আসা হযরত আলী মূলত নিজের দোকানের জন্য কিছু মালামাল কিনতে ঢাকায় এসেছিলেন। ফেরার পথে তিনি শহীদ হাদির উক্তি লেখা একটি টি-শার্ট এবং তার বইও কিনেছেন। অন্যদিকে পুরান ঢাকা থেকে আসা আফসার উদ্দিন তানভীর হাদির বইয়ের পাশাপাশি স্মারক হিসেবে একটি আয়না ও চিরুনিও কিনেছেন। তার মতে, হাদি ভাইয়ের লেখায় যে আত্মমর্যাদার কথা উঠে আসে, তা মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।
পল্লবী থেকে আসা আশিকুর রহমান মনে করেন, ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ একটি যুগান্তকারী বই। তার ভাষায়, “হাদি ভাই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। এই বই তরুণদের নতুন করে ভাবতে ও লড়াই চালিয়ে যেতে সাহস জোগাবে।”
সেগুনবাগিচা থেকে আসা খুশনুমা আক্তার জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইটির কিছু কবিতা পড়ে তার ভালো লেগেছে। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি বইটি কিনতে মেলায় এসেছেন। তিনি বলেন, “ভাই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার বই আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে থাকবে।”
ক্যান্টনমেন্ট থেকে আসা বেগম বদরুন নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, “শুধু হাদি ভাইয়ের লেখা বলেই বইটি কিনেছি। তার শব্দচয়ন খুবই সুন্দর।” তবে স্টলটি খুঁজে পেতে তাকে কিছুটা সময় ব্যয় করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইডেন মহিলা কলেজ (Eden Mohila College) এর শিক্ষার্থী নুরে হাবিবা জানান, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে প্রায় ১০ থেকে ২০ মিনিট খোঁজাখুঁজির পর তিনি বইটির স্টলের সন্ধান পান। তিনি বলেন, হাদি ভাইয়ের লড়াই সম্পর্কে জানতে শুরু করার পর থেকেই তার বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka) এর দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, হাদি ভাইয়ের কথা মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। আমরা তাকে হারিয়েছি, কিন্তু তার লড়াই থেমে থাকতে পারে না। তাই তার কথার মতোই তার লেখাও আমাদের অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছে।
বইয়ের চাহিদা ও স্টল সম্পর্কে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের স্টল ইনচার্জ জিএ সাব্বির জানান, মেলার শুরু থেকেই শহীদ হাদি ভাইয়ের বইয়ের চাহিদা অত্যন্ত বেশি। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার কপি বই বিক্রি হয়েছে। তাদের ধারণা, বইটি এবারের মেলার সর্বাধিক বিক্রীত বইগুলোর একটি হতে পারে। তিনি আরও জানান, তাদের স্টলটি বাংলা একাডেমি (Bangla Academy) প্রাঙ্গণের ৫৪৭ নম্বর স্টলে অবস্থিত।
জীবদ্দশায় শহীদ হাদি বিদেশি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তার লড়াই ছিল ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার। বইমেলায় ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সামনে পাঠকের ভিড় যেন আজও সেই সংগ্রামের স্মৃতিই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে।
