পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে এলেই রাজধানী ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছুটে যান বিপুলসংখ্যক মানুষ। স্থলপথের পাশাপাশি নদীপথেও তখন যাত্রীচাপ বাড়ে কয়েকগুণ। এই চাপ সামাল দিতে লঞ্চ মালিকরা অনেক সময় পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন লঞ্চ নামমাত্র মেরামত করে নদীপথে নামানোর অভিযোগ ওঠে। ঈদকে ঘিরে এসব লঞ্চে দ্রুত রঙ ও সাজসজ্জা করে নতুনের মতো রূপ দেওয়ার কাজ চলছে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে।
ঈদের আগে পুরোনো লঞ্চ মেরামত ও রঙের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। অন্যান্য বছরের মতো এবারও কেরানীগঞ্জের ডকইয়ার্ডগুলোতে চলছে লক্কড়ঝক্কড় লঞ্চ সংস্কার ও বাহ্যিক সাজসজ্জার কাজ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদী (Buriganga River) তীরবর্তী চর কালীগঞ্জ থেকে কোন্ডা ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি ডকইয়ার্ড গড়ে উঠেছে। এসব ইয়ার্ডে ঢুকতেই শোনা যায় ধাতব টুংটাং শব্দ। কোথাও যাত্রীবাহী লঞ্চ, আবার কোথাও বড় কার্গো লঞ্চের মেরামত চলছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শ্রমিকরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন—কেউ ওয়েল্ডিং করছেন, কেউ লঞ্চের গায়ে রঙ তুলির আঁচড় দিচ্ছেন।
কেরানীগঞ্জ এলাকার অন্তত ১০টি ডকইয়ার্ড ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে। তেলঘাট থেকে মীরেরবাদ পর্যন্ত প্রায় সাতটি ইয়ার্ডে পুরোনো লঞ্চে রঙ করা, কাঠামো মেরামত এবং যান্ত্রিক ত্রুটি সারানোর কাজ চলছে।
অনেক ফিটনেসবিহীন লঞ্চকে রঙ করে নতুনের মতো দেখানো হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ভেঙে যাওয়া অংশ জোড়া দেওয়া, লোহার পাত বসিয়ে কাঠামো মজবুত করার কাজও চলছে। কোথাও আবার নতুন ডিজাইনের কাজ করা হচ্ছে। তেলঘাট ও কেরোসিনপট্টি এলাকার ইয়ার্ডগুলোতে কয়েকটি লঞ্চের নিচের অংশ মেরামত করতে দেখা গেছে।
খেজুরবাগ থেকে পারগেন্ডারিয়া পর্যন্ত নদীর ধারে সারি সারি লঞ্চ নোঙর করে রাখা হয়েছে। শ্রমিকরা মরিচা ধরা লোহার অংশ ঘষে পরিষ্কার করছেন, কোথাও কাঠের অংশ বদলানো হচ্ছে, আবার কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি সারানো হচ্ছে।
ডকইয়ার্ডের শ্রমিক রবিউল জানান, ঈদের আগে হঠাৎ করেই কাজের চাপ বেড়ে যায়। বছরের অন্য সময় যেসব লঞ্চ তেমন মেরামত করা হয় না, ঈদ ঘনিয়ে এলে সেগুলো দ্রুত রঙ ও সামান্য সংস্কার করে যাত্রী পরিবহনের উপযোগী করে তোলা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক শ্রমিক বলেন, ঈদ এলেই পুরোনো লঞ্চ ডকে ভিড়তে শুরু করে। দ্রুত রঙ করে চালানোর মতো করে দেওয়া হয়। অনেক সময় শুধু প্রয়োজনীয় অংশে সামান্য কাজ করেই লঞ্চ প্রস্তুত করা হয়।
তিনি জানান, ঈদের আগে ফিটনেস লাইসেন্স নিতে হয়। তাই অনেক ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ নামমাত্র সংস্কার করা হয়। কেরানীগঞ্জের চর কালীগঞ্জ, তেলঘাট, খেজুরবাগ ও হাসনাবাদ এলাকার ডকইয়ার্ডে অন্তত ৫০টি লঞ্চ মেরামত ও রঙ করতে দেখা গেছে। স্থানীয়দের মতে, ফিটনেসবিহীন লঞ্চের সংখ্যা আরও বেশি।
একজন ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে কাজ দ্রুতগতিতে চলছে। অনেক বড় ত্রুটিও কখনো কখনো রঙের আড়ালে ঢেকে দেওয়া হয়।
এক ডকইয়ার্ড মালিক অভিযোগ করে বলেন, পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন অনেক লঞ্চ যেসব ব্লকে মেরামত করা হচ্ছে তার বেশির ভাগই অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইয়ার্ড। অভিযোগ দেওয়ার পরও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (Bangladesh Inland Water Transport Authority) তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। এতে বৈধ ডকইয়ার্ড মালিকদেরও এসব অনিয়মের দায় নিতে হয়।
ভোলাগামী লঞ্চযাত্রী জাকির হোসেন বলেন, ঈদযাত্রায় প্রায় প্রতি বছরই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি যেতে হয়। তার মতে, শুধু বাহ্যিক রঙ নয়—যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি। অনেক সময় পুরোনো লঞ্চগুলো বাইরে থেকে নতুন মনে হলেও ভেতরের যান্ত্রিক অবস্থা পুরোপুরি পরীক্ষা করা হয় না।
নৌপথে ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত পরিদর্শনের দাবি জানিয়েছেন যাত্রী ও সচেতন মহল।
অভিযোগের বিষয়ে প্রিন্স অব আওলাদ লঞ্চের পরিচালক মো. যুবরাজ বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছরই লঞ্চে মেরামত ও রঙের কাজ করা হয়। ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং (Department of Shipping) থেকে যেসব জাহাজ চলাচলের অনুমতি পায়, সেগুলোই নদীপথে চলাচল করে। লঞ্চের ফিটনেস আছে কি না, তা দেখার দায়িত্বও তাদের।
এ বিষয়ে ঢাকার নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার ও যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, ঈদকে সামনে রেখে লঞ্চ মালিকরা যাত্রী আকর্ষণের জন্য লঞ্চে রঙ ও মেরামতের কাজ করেন। কোনো ফিটনেসবিহীন জাহাজ বা লঞ্চ সদরঘাট কিংবা দেশের অন্য কোনো নদীবন্দরে চলাচলের অনুমতি নেই।
তিনি জানান, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল (Sadarghat Launch Terminal) সহ দেশের নদীবন্দরগুলোতে চলাচলের আগে ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং ফিটনেস সনদ দেয়। এরপর বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা শাখা লঞ্চের সময়সূচি নির্ধারণ করে। সেই সময়সূচি অনুযায়ী লঞ্চ ঘাট থেকে ছেড়ে যায়।

