ওয়ান-ইলেভেনের অন্ধকার উন্মোচন: রিমান্ডে মাসুদ, বেরিয়ে আসছে গোপন পরিকল্পনার স্তর

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অন্যতম কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এখন ডিবি পুলিশের খাঁচায়। পাঁচদিনের রিমান্ডে থাকা এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তার জিজ্ঞাসাবাদে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে সেই সময়ের বহু অন্ধকার অধ্যায়, যা দীর্ঘদিন ধরেই আড়ালে ছিল।

নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রের দাবি, রিমান্ডে তিনি জানিয়েছেন— বিতর্কিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনের মূল পরিকল্পনা তৈরি করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (Research and Analysis Wing)। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয় তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে। ২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের মেয়াদের শেষদিকে শুরু হওয়া এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক অফিসের সঙ্গে সমন্বয় করে বিশ্ব সংস্থার নামে ভুয়া চিঠি তৈরি করা হয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের মতে, রিমান্ডে মাসুদের অবস্থান একেবারেই সরল নয়। প্রশ্নের জবাবে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই এড়িয়ে যাচ্ছেন, আবার কখনো উল্টো বয়ান দিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে ওয়ান-ইলেভেন সরকার গঠনে সক্রিয় ভূমিকা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নির্যাতন এবং মানবপাচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

গত সোমবার (২৩ মার্চ) রাতে রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। পরদিন ঢাকার পল্টন থানায় দায়ের হওয়া মানব পাচার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ইতোমধ্যে তার বিরুদ্ধে ঢাকা ও ফেনীতে অন্তত ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

রিমান্ড শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় তাকে। বিক্ষুব্ধ জনতা তার দিকে ময়লা পানি নিক্ষেপ করে, স্লোগান দেয় এবং কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর মতে পোড়া মবিল ছুড়ে মারা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ দ্রুত তাকে সরিয়ে নেয়।

রিমান্ডে মাসুদের লুকোচুরি ও দায় এড়ানোর কৌশল

ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় মাসুদ উদ্দিন নিজেকে অনেকটা নির্দোষ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। তিনি ১/১১-এর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায় চাপাচ্ছেন তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের তিন কর্মকর্তা— মেজর জেনারেল (অব.) এটিএম আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারী এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দারের ওপর।

তার দাবি, ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়ন এবং তথাকথিত কিংস পার্টি গঠনের মূল কারিগর ছিলেন এটিএম আমিন। কিন্তু তদন্তকারীদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, নবম ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি হিসেবে মাসুদের ভূমিকাই ছিল সবচেয়ে আক্রমণাত্মক। বিশেষ করে খালেদা জিয়া (Khaleda Zia) এবং তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর ওপর নির্যাতনের অভিযোগে তার নির্দেশনার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

১/১১-এর পেছনের বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ

রিমান্ডে মাসুদ দাবি করেছেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত। তার ভাষ্যমতে, জামায়াত-শিবিরের চারজন নেতাকর্মীকে লগি-বৈঠা দিয়ে হ’\ত্যা করে তাদের মরদেহের ওপর নৃত্য করার ঘটনাটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। এর মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে একটি ভিন্ন ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করা হয়।

তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের তৎকালীন আবাসিক প্রতিনিধিকে প্রভাবিত করে ভুয়া চিঠি তৈরির ঘটনাও সেই পরিকল্পনার অংশ ছিল। এই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ (Iajuddin Ahmed)-এর সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করা হয়।

দুর্নীতির বিশাল জাল

রাজনৈতিক ভূমিকার বাইরে মাসুদ উদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে বিপুল দুর্নীতির অভিযোগ। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে তিনি ‘ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশাল একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের মামলা দায়ের হয়েছে। তবে রিমান্ডে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি হয় নীরব থাকছেন, নয়তো অসংলগ্ন উত্তর দিচ্ছেন।

জুলাই আন্দোলন ও হ’\ত্যা মামলার অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে। ফেনীর মহিপালে গু’\লি’\তে ১১ জন নি’\হত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর অন্যতম প্রধান আসামি তিনি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের হয়।

একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই সামরিক কর্মকর্তা এখন আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে বন্দি। আদালতে নেওয়ার সময় জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই যেন বলে দিচ্ছে— তার বিরুদ্ধে জমে থাকা অসন্তোষ কতটা গভীর।