রকেট আতঙ্কে খালি হচ্ছে উত্তর ইসরায়েল, নাগরিকদের থামাতে নেতানিয়াহুর আকুতি

লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর অবিরাম রকেট হামলার মুখে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তঘেঁষা জনপদগুলোতে এখন চরম অস্থিরতা ও ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে, বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তবে এই বাস্তবতার মধ্যেই দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) স্থানীয় মেয়রদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—যেন তারা নাগরিকদের এলাকা ত্যাগ করা থেকে বিরত রাখেন।

বুধবার (২৫ মার্চ) সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল বৈঠকে তিনি স্বীকার করেন, বিশেষ করে বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য হঠাৎ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। হিজবুল্লাহর রকেট হামলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কবার্তা প্রায় নেই বললেই চলে। সাইরেন বাজার পর নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে বাসিন্দারা মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পান—যা অনেকের জন্য কার্যত অসম্ভব।

এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় কাউন্সিল প্রধানদের প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। মাত্তে আশের আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রধান মোশে দাভিদোভিচ অভিযোগ করেছেন, সরকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি ২০১৮ সালের ‘নর্দান শিল্ড’ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, সীমান্তবর্তী হাজার হাজার বাড়িতে বোম শেল্টার তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ২০২৬ সালেও বহু মানুষ এখনো অরক্ষিত অবস্থায় বসবাস করছেন।

তার মতে, আগের সংঘাতগুলোতে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ থাকলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন—মানুষ নিজ ঘরে থেকে কেবল প্রার্থনা করছে। সরকারি বাজেটে সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় সীমান্তবর্তী ৫ হাজারের বেশি অ-আবাসিক ভবন এবং অসংখ্য বাড়ি এখন রকেট হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলীয় মার্গালিওট মোশ্যাভের প্রধান ইতান দাভিদি এক আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেন, সাম্প্রতিক রকেট হামলায় নি’\হত ২৭ বছর বয়সী নুরিএল দুবিনের মৃত্যু তাদের জন্য গভীর শোকের প্রতীক। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরে বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া এক তরুণকে এখন কবর দিতে হচ্ছে—এটাই বাস্তবতা। দাভিদি আক্ষেপ করে বলেন, “ইসরায়েল আমাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এখন লেবাননের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।”

তিনি আরও জানান, বহুবার সহায়তার আবেদন জানানো হলেও রাষ্ট্র কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তার মতে, নাগরিকরা নিজেদের ঘরবাড়ি রক্ষায় চেষ্টা চালালেও রাষ্ট্রের সমর্থন ছাড়া তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

কিরিয়াত শমোনা শহরের মেয়র আভিচাই স্টার্নও সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, লেবানন বা ইরানে যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক, যদি দেশের একটি শহরই ধ্বংস হয়ে যায়, সেটাই হবে প্রকৃত পরাজয়। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, প্রায় ২৪ হাজার মানুষের শহরে এখন মাত্র ১০ হাজার বাসিন্দা অবশিষ্ট আছে। পরিস্থিতি এমনই যে, আগামী এক মাসের মধ্যে শহরটি পুরোপুরি জনশূন্য হয়ে পড়তে পারে।

স্টার্ন জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৪ হাজার ৭০০টি অরক্ষিত বাড়ি থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে যারা শারীরিকভাবে অক্ষম বা বয়স্ক, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হিজবুল্লাহর রকেট হামলা উত্তর ইসরায়েলের জনজীবনকে কার্যত বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বৃহস্পতিবারও ক্লাস্টার বোমার আঘাতে অন্তত একজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

যদিও ইসরায়েল দাবি করছে তারা হিজবুল্লাহ ও ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যেই অভিযান চালাচ্ছে, বাস্তবে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। সাইরেনের শব্দ, বিস্ফোরণের গর্জন আর অনিশ্চয়তার এই চক্রে বন্দি হয়ে পড়া মানুষদের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় নেতারা।