জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের প্রেক্ষাপটে বাজারে ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর এক ধরনের পাঁয়তারা চলছে—এমনটাই দাবি করেছেন খুচরা বিক্রেতারা। তাদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত তুলে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানায় বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (Bangladesh Vegetable Oil Refiners and Vanaspati Manufacturers Association)। এ লক্ষ্যে তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় (Ministry of Commerce) এবং ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেয়। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে সরকার কোনো বৈঠক বা সিদ্ধান্ত নেয়নি।
রাজধানীসহ বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং মফস্বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহে এই সংকট চলছে। চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল বাজারে ছাড়ছে কোম্পানিগুলো। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, বোতলজাত তেলে লাভ কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলো সরবরাহে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
রাজধানীর নয়াবাজারে দেখা গেছে, অধিকাংশ দোকানেই এক ও দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রায় অনুপস্থিত। পাঁচ লিটারের বোতল থাকলেও তা খুব সীমিত। একই চিত্র দেখা গেছে কারওয়ান বাজারেও—বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ চোখে পড়ার মতো কম।
নয়াবাজারের ‘মায়ের দোয়া স্টোর’-এর বিক্রেতা ইমাম উদ্দিন বাবলু জানান, সংকট সামনে আরও বাড়তে পারে। তিনি বলেন, রমজানের ২০ তারিখের পর যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাতে অনেক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছিল। এখন জ্বালানি সংকটকে সামনে এনে আবারও বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে আমদানিনির্ভর মসলাসহ বেশ কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
তার অভিযোগ, ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো লুকোচুরি করছে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে না পেরে তারা দেড় মাস ধরে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন কমিয়ে দিয়ে কৌশলে বাজারে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, সামনে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেকেই মজুত থাকলেও বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি অন্য পণ্য না কিনলে অনেক দোকান শুধু সয়াবিন তেল বিক্রি করছে না বলেও জানান তিনি। আগে যেখানে এক-দুই লিটারের বোতলে পাঁচ থেকে সাত টাকা এবং পাঁচ লিটারে ২০ টাকা কমিশন মিলত, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে এক থেকে পাঁচ টাকায়। ফলে খুচরা বিক্রেতাদের আগ্রহ কমে গেছে।
কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের দোকানি আব্দুর রশিদ বলেন, ছোট বোতলের সয়াবিন বিক্রি করে এখন আর লাভ হয় না। উপরন্তু সরবরাহও ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ বাড়তি দামে বিক্রি করছেন।
কেরানীগঞ্জের বউবাজারের দোকানি নাফিস জানান, দেড় মাসের বেশি সময় ধরে এই সংকট চলছে এবং ঈদের পর তা আরও তীব্র হয়েছে। অনেক দোকানেই বোতলজাত সয়াবিন পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে কোথাও কোথাও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ সংকট কাটাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ছয় টাকা বাড়ানো হয়। সে অনুযায়ী এক লিটার ১৯৫ টাকা, দুই লিটার ৩৯০ টাকা এবং পাঁচ লিটার ৯৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর কোম্পানি পর্যায়ে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও পরিবেশক পর্যায়ে দাম বেড়েছে। ফলে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে।
বর্তমানে দোকানিরা পাঁচ লিটারের বোতল ৯৪৫ টাকায় কিনে ৯৫০ থেকে ৯৫৫ টাকায় বিক্রি করছেন। অথচ মাস দেড়েক আগে এটি ৯৩৫ টাকায় কিনে ৯৪০-৯৪৫ টাকায় বিক্রি করা হতো। অর্থাৎ এমআরপির মধ্যে থাকলেও ভোক্তার জন্য বাস্তবে দাম বেড়েছে। রাজধানীর কিছু এলাকায় এমআরপির চেয়েও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বোতলজাত তেলের সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও বাড়তে শুরু করেছে। পাইকারি বাজারে প্রতি কেজিতে প্রায় পাঁচ টাকা করে বেড়েছে। গতকাল কারওয়ান বাজারে খোলা সয়াবিন তেল ১৯৮ থেকে ২০০ টাকা এবং পাম তেল ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (Consumers Association of Bangladesh – CAB)-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, সরকারি নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই বারবার নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে।
তার ভাষ্য, রমজানের আগেই কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল। তখন তা সম্ভব না হওয়ায় তারা সরবরাহ ও কমিশন কমিয়ে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে সরকারকে দাম বাড়াতে বাধ্য করার কৌশল নেওয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
