তেলের লাইনে উত্তেজনা: সংকট না আতঙ্ক—দেশজুড়ে অস্থিরতা, সংঘর্ষ ও মজুতের অভিযোগ

ইরান যু’\দ্ধের জেরে দেশে জ্বালানি তেল ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল আকার নিচ্ছে। বিশেষ করে অকটেন ও পেট্রোলের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখনো দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ঘটছে নানা অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক ঘটনা।

ফিলিং স্টেশনে তেল না পেয়ে পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপায় খু’\নের অভিযোগ উঠেছে—যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই তুলে ধরে। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে, মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে সাইকেলে করে এনে তেল নেওয়ার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এইসব দৃশ্য এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এর পাশাপাশি জোর করে পাম্প থেকে তেল নেওয়ার অভিযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় বসতবাড়ি, গোয়ালঘর বা বাঁশঝাড়ের নিচে তেল মজুতের ঘটনাও উদঘাটন করছে প্রশাসন। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হচ্ছে, সংকটের পাশাপাশি সুযোগ নেওয়ার প্রবণতাও সমানতালে বেড়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই বলা হচ্ছে—দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তবে প্রতিদিনই ফিলিং স্টেশনগুলোতে শত শত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সংসদে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু (Iqbal Hasan Mahmud Tuku) বলেন, এই দীর্ঘ লাইন প্রকৃত সংকটের প্রতিফলন নয়; বরং অতিরিক্ত ক্রয় ও মজুতের প্রবণতায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ এবং জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ‘ফুয়েল কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেয়। তবে এই কার্ড সংগ্রহ ঘিরেও কয়েকটি জেলায় মারামারির ঘটনা ঘটেছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশনস) মনির হোসেন চৌধুরী (Monir Hossain Chowdhury) বলেন, তেলের কোনো ঘাটতি না থাকলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, “এটি অনেকটাই মনস্তাত্ত্বিক। যুদ্ধের কারণে প্যানিক বায়িং বেড়েছে, কেউ সুযোগ নিচ্ছে, আবার কেউ আতঙ্কে বেশি কিনছে।”

এর আগেও বিদ্যুৎমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, একটি গোষ্ঠী তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছে।

সমাজ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক (Towhidul Haque) মনে করেন, এ ধরনের পরিস্থিতি সামাজিক বৈকল্যের বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, কোনো পণ্যের সংকট দেখা দিলে লাভের আশায় বা আতঙ্কে মানুষ অতিরিক্ত সংগ্রহে ঝুঁকে পড়ে, যার ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

যু’\দ্ধ শুরুর পরপরই তেল নিয়ে অস্থিরতা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হা’\মলা শুরুর পর থেকেই দেশে তেল সরবরাহ নিয়ে এক ধরনের উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। এর পরপরই বোতল, ড্রাম এমনকি মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে তেল কেনার প্রবণতা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার তেল কেনায় সীমা নির্ধারণ করে রেশনিং চালু করে, যদিও পরে তা তুলে নেওয়া হয়।

কিন্তু সেই সময় শুরু হওয়া দীর্ঘ লাইন এখনো কমেনি। অনেক ফিলিং স্টেশন ‘তেল নেই’ প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে বন্ধ রাখা বা সীমিত পরিমাণে বিক্রি করছে। ফলে যেখানেই তেল বিক্রি শুরু হচ্ছে, সেখানেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে মানুষ।

কালোবাজার ও সহিংসতার বিস্তার

অভিযোগ রয়েছে, কিছু ব্যক্তি পাম্প থেকে তেল নিয়ে তা খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি করছে। এই তেল লিটারপ্রতি ২০০ টাকার বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে বলেও জানা গেছে। দীর্ঘ লাইনের ঝামেলা এড়াতে অনেকেই বেশি দামে সেই তেল কিনছেন।

নড়াইলে তেল না পাওয়াকে কেন্দ্র করে পেট্রল পাম্প ম্যানেজারকে ট্রাকচাপায় খু’\নের ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ২৯ মার্চ নড়াইল-যশোর মহাসড়কের তুলারামপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে এবং এতে একটি মামলা হয়েছে।

অন্যদিকে ফরিদপুরে অভিযান চালিয়ে ২৮ হাজার লিটার তেল উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে একটি পাম্পে ‘তেল নেই’ লিখে সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছিল। নাটোরে বাঁশঝাড়ের নিচে ১০ হাজার লিটার তেল মাটির ট্যাংকে লুকিয়ে রাখার ঘটনাও সামনে এসেছে।

ময়মনসিংহে এক মুদি দোকানির বাড়ি থেকে তেল জব্দ করে তা বিক্রি করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অদ্ভুত চিত্র ও মানবিক বিপর্যয়

গাইবান্ধায় বাচ্চু মিয়া নামে এক ব্যক্তি মোটরসাইকেলের ট্যাংক খুলে সাইকেলে করে তেল নিতে যাওয়ার পর বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনায় আসে। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে।

চুয়াডাঙ্গায় ‘ফুয়েল কার্ড’ সংগ্রহ করতে গিয়ে বখতিয়ার নামে এক ব্যক্তির মৃ’\ত্যু হয়েছে। একই এলাকায় কার্ড নেওয়া নিয়ে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। লালমনিরহাটে তেল নিয়ে সংঘর্ষ কাদামাটিতে গড়িয়েছে।

এদিকে নীলফামারীতে ট্যাংক-লরি শ্রমিকদের ধর্মঘটে উত্তরাঞ্চলের আট জেলায় তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যদিও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো অস্থির। সরকার বলছে তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আতঙ্ক, মজুতদারি এবং নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে জ্বালানি খাত এখন এক জটিল সংকটের মুখোমুখি।