ইরান অভিযানে ‘শেষ ধাপে’ যুক্তরাষ্ট্র, আরও ২–৩ সপ্তাহে চূড়ান্ত আঘাতের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। স্থানীয় সময় বুধবার (বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকালে) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি জানান, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাজ শেষ করতে’ আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

ভাষণে ট্রাম্প বলেন, মাত্র এক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল বিশ্বের প্রধান সন্ত্রাসপৃষ্ঠপোষক দেশ হিসেবে চিহ্নিত ইরান (Iran)। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত চার সপ্তাহে মার্কিন বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত, সিদ্ধান্তমূলক এবং অপ্রতিরোধ্য সাফল্য অর্জন করেছে।

তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে বিধ্বংসী আঘাত হেনেছে এবং কৌশলগত লক্ষ্য এখন প্রায় অর্জনের পথে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে এমন একতরফা দাবি যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

পারমাণবিক ইস্যুতে আবারও কড়া অবস্থান তুলে ধরে ট্রাম্প বলেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির কাছাকাছি ছিল—যদিও এই দাবির পক্ষে তিনি কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ দেননি। এর বিপরীতে, যুদ্ধ শুরুর আগেও ইরান একাধিকবার জানিয়েছে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে নেই।

ট্রাম্প আরও বলেন, ২০১৫ সাল থেকে তিনি বলে আসছেন—ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেওয়া হবে না। তার ভাষায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল (Israel)-এর বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব পোষণ করে।

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি প্রসঙ্গে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি সেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে না এলে আজ ইসরায়েলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ত। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা (Barack Obama) প্রশাসনের সময় এই চুক্তি সম্পাদিত হয়, যার আওতায় ইরান ইউরেনিয়াম মজুদ সীমিত করতে রাজি হয়েছিল এবং বিনিময়ে তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। তবে ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।

সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ট্রাম্পের বড় দাবি

ভাষণে ট্রাম্প আরও বলেন, ইরানের নৌ ও বিমান বাহিনী কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং দেশটির অনেক শীর্ষ নেতা আর জীবিত নেই। তার দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও ড্রোন হামলার সক্ষমতাও নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

এ সময় তিনি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ইসরায়েলসহ উপসাগরীয় দেশগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তারা অসাধারণ কাজ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেবে না।

‘চরম আঘাত’ ও নতুন হুমকি

ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর আরও বড় ধরনের আঘাত হানা হবে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ইরানকে “প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে” দিতে পারে।

তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কখনো শাসন পরিবর্তন ছিল না, তবে দেশটির প্রধান নেতার মৃত্যুর ফলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয়েছে।

একইসঙ্গে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন—যদি দ্রুত কোনো চুক্তি না হয়, তবে ইরানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোও হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে একযোগে এসব স্থাপনায় আঘাত হানা হবে।

অর্থনৈতিক প্রভাব: জ্বালানি দামে চাপ

যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতিও স্বীকার করেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির দাম ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।

তবে তার দাবি, এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং এর জন্য ইরানের কর্মকাণ্ডই দায়ী। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান প্রতিবেশী অঞ্চলে বাণিজ্যিক তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, যার ফলেই বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

মিত্রদের প্রতি কৃতজ্ঞতা

ভাষণের শেষ অংশে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের মিত্র দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বিশেষভাবে ইসরায়েল, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের নাম উল্লেখ করে বলেন, তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের পাশে রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে তাদের ব্যর্থ হতে দেবে না।