দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণের নামে আত্মসাৎ করে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ফেরাতে কার্যক্রম জোরদার করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে চলতি এপ্রিল মাসের মধ্যেই বিদেশি আইনি সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অপ্রকাশযোগ্য চুক্তি (এনডিএ) সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান (Mostak U Rahman)।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে একীভূত পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকদের এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। আলোচনায় উঠে আসে—সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক (Social Islami Bank), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (First Security Islami Bank), গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (Global Islami Bank), ইউনিয়ন ব্যাংক (Union Bank) ও এক্সিম ব্যাংক (EXIM Bank)—এই পাঁচটি ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টি।
এর মধ্যে প্রথম চারটি ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে এস আলম গ্রুপ (S Alam Group)-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল। অভিযোগ রয়েছে, এই গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের আড়ালে বের করে নিয়েছে। অন্যদিকে, এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো নাসা গ্রুপ (Nassa Group)-এর কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের কর্তৃত্বে, যেখানে ঋণের পরিমাণ ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
জানা গেছে, ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠীর মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে ইতোমধ্যে ১০টি ব্যাংক ৩৬টি এনডিএ চুক্তি সম্পন্ন করেছে। এই শিল্পগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে—এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপ (Aramit Group), প্রয়াত জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপ (Sikder Group), সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ (Beximco Group), ওরিয়ন গ্রুপ এবং নাসা গ্রুপ।
এস আলম গ্রুপের অর্থ উদ্ধারে মোট ১০টি এনডিএ স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে তিনটি সম্পন্ন হয়েছে। আরামিট গ্রুপের ক্ষেত্রে ইউসিবি ব্যাংক ছয়টি এনডিএ সম্পন্ন করেছে, যেখানে তাদের ঋণের পরিমাণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা, যার বড় অংশ নেওয়া হয়েছে জনতা ব্যাংক থেকে। এই গ্রুপের বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারের দায়িত্ব পড়েছে জনতা ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ওপর, এবং ইতোমধ্যে ৯টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
সিকদার গ্রুপের বিরুদ্ধে ৯টি এনডিএ সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে তাদের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। নাসা গ্রুপের ক্ষেত্রে ৮টি এনডিএ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে, ওরিয়ন গ্রুপ ও এর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা, এবং তাদের বিরুদ্ধে একটি এনডিএ করা হয়েছে।
বৈঠকে গভর্নর স্পষ্ট নির্দেশ দেন, আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গিয়ে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধার করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে এসব ব্যাংককে সচল করাও জরুরি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ব্যাংকভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইউনিয়ন ব্যাংক (Union Bank)-এর খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৯৭ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (First Security Islami Bank)-এর খেলাপি ঋণের হার ৯৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক (Global Islami Bank)-এর ৯৬ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক (Social Islami Bank)-এর ৩৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংক (EXIM Bank)-এর খেলাপি ঋণের হার ৬২ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
