জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জারি করা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল এবং কিছু পুনঃযাচাইয়ের সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। তবে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও নীতিনির্ধারণী মহলে।
সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধনীসহ পাসের জন্য সংসদের কাছে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় অধ্যাদেশসহ চারটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া গণভোট, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন সংশোধন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য অধিকার সংশোধনসহ ১৬টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে নতুন করে বিল আকারে উত্থাপনের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়েছে সময়সীমা ঘিরে। আগামী ৯ এপ্রিলের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ আইন হিসেবে পাস না হলে বাতিলের তালিকায় থাকা চারটিসহ যাচাই-বাছাইয়ের জন্য রাখা ১৬টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, এমনটি ঘটলে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শুরু হওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের বড় অংশই মুখ থুবড়ে পড়তে পারে।
এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বদিউল আলম মজুমদার (Badiul Alam Majumdar), সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত না করে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তার ভাষায়, “সরকার বিচার বিভাগের সংস্কারের পক্ষে না বিপক্ষে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।”
বিচার বিভাগ নিয়ে বিতর্ক আরও স্পষ্ট হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ ঘিরে। সরকারের যুক্তি—এই অধ্যাদেশ বহাল থাকলে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের সমন্বয় বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং প্রধান বিচারপতির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। তবে এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিরোধী দল।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া (Jyotirmoy Barua) মনে করেন, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল, যা বাতিল না করে বরং পর্যালোচনা শেষে পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ দেওয়া উচিত।
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ নিয়েও মতপার্থক্য তীব্র। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্তে পূর্বানুমতির প্রয়োজন রয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তাজনিত কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দিতে হবে। তবে বিরোধীদের দাবি, এতে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে এবং ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।
গণভোট অধ্যাদেশের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলেছে বিশেষ কমিটি। তাদের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে করা এই অধ্যাদেশ সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতাকে খর্ব করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ (Dr. Sabbir Ahmed) মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিলের এই সুপারিশ সরকার বা প্রধান রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা দেয়। তার মতে, “যদি বাস্তবায়নের ইচ্ছা থাকত, তাহলে গণভোটের রায় কার্যকর করা হতো। এতে বোঝা যাচ্ছে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার প্রবণতা রয়েছে।”
অন্যদিকে, এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অবস্থান স্পষ্ট নয়। সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। আর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী মন্তব্য করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং রাজনৈতিক মতবিরোধ—এই দুইয়ের চাপে এখন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে।
