ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান রবিবার (৫ এপ্রিল) সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে কান্নাভেজা কণ্ঠে প্রশ্ন তুলেছেন, যারা নিজে গুমের শিকার ও ফ্যাসিস্ট আমলে নানা নিপীড়নের সম্মুখীন হয়েছেন, তারা কিভাবে গুম প্রতিকার ও প্রতিরোধ আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন বাতিলের সুপারিশ দিতে পারে। তিনি বলেন, অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধনী থাকলে আইন আকারে পাসের পর তা সংশোধনের সুযোগ থাকা উচিত।
পয়েন্ট অব অর্ডারে ব্যারিস্টার আরমান গুমের সময় তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি একটি অন্ধকার ঘর থেকে ফিরে এসে। এখানে আমার মত আরও শত শত লোককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু অনেকের আবার ফিরে আসার সৌভাগ্য হয়নি। আমরা, যারা গুমের শিকার, সেই অন্ধকার ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুণছিলাম। মনে হতো হয়তো আমাদের হত্যা করা হবে। কথা বলার কেউ ছিল না, কিট-পতঙ্গ, পিপড়া, টিকটিকির সঙ্গে কথা বলতাম।”
তিনি আরও বলেন, “বুঝতে পারতাম না বাইরে দিন না রাত। মনে হতো জীবন্ত কবর দেওয়া হচ্ছে। মনে হতো মৃত্যু এর থেকে হাজার গুণ ভাল। একদিন রাতে টেনে-হিঁচড়ে যখন আমাকে সেখান থেকে বের করছিল, আমি ধরে নিয়েছিলাম এখন আমাকে হত্যা করা হবে। আমি সুরা ইয়াসিন পড়া শুরু করলাম যেন মৃত্যুটা সহজ হয়। পরে জানতে পারলাম কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে জীবন দিয়ে, চোখ হারিয়ে আমাদের আবার দুনিয়া দেখার সুযোগ দিয়েছে।”
সংসদে মজলুমদের মিলনমেলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখানে এমন কেউ পাওয়া যাবে না যে গত ফ্যাসিস্ট আমলে জুলুমের শিকার হয়নি। আমরা যারা ফিরে এসেছি, আমরা চাই যে এই জুলুম যেন বাংলার মাটিতে আর না ঘটে। এই উদ্দেশ্যে গুম প্রতিকার এবং প্রতিরোধ আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণীত হয়েছিল। কিন্তু বিশেষ কমিটি এই আইনগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছে। কিভাবে, যারা নিজে গুমের শিকার, তারা এই আইন বাতিলের পরামর্শ দিচ্ছে?”
ব্যারিস্টার আরমান সরকারের কাছে আবেদন জানান, “যদি আইন সংশোধন করতে চায়, প্রথমে অনুমোদন দিয়ে আইন আকারে রূপান্তরিত করুক, তারপর সংশোধনী আনা হোক। নইলে ১২ তারিখ আইন বাতিল হলে ১৩ তারিখ গুমের কোন সংজ্ঞা থাকবে না।”
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান এই বক্তব্যের জবাবে বলেন, “গুমের শিকার সবাই আমার স্বজন, ভাই-বোন, আত্মীয়, প্রতিবেশী। যারা বিরোধী পার্টির প্রতিনিধিরা হইচই করছেন, তারা হয়তো আইনটি ভালোভাবে দেখেননি। মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ আইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে গুমের শিকারদের প্রতি অবিচার না হয়। আইসিটি আইন-১৯৭৩ অনুযায়ী ক্রাইম এগেইন্স্ট হিউম্যানিটির মধ্যে গুমের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত, সেখানেই বিচার হবে।”
আইনমন্ত্রী বলেন, “গুম আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন, অথচ অর্ডিনেন্সে ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন আইনের টাইম ফ্রেম অনুযায়ী যদি রাখা হয়, শিকাররা অতিরিক্ত হয়রানির মুখে পড়বেন। আমরা চাই এই দুই আইন আরও যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সেশন চলাকালীন বা পরবর্তীতে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট বিল আনা হবে। অপরাধীরা কোনওভাবেই ফাঁকফোকর পাবেন না।”
তিনি যোগ করেন, “ব্যারিস্টার আরমানসহ গুমের ভুক্তভোগীরা যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সদস্য হিসেবে থাকবেন এবং মতামত দেবেন। বাংলাদেশের ৭০০’র বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। যারা অপরাধে জড়িত, তারা আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করতে পারবে না।”
