জাতীয় সংসদে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরে কঠোর সমালোচনা করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khasru Mahmud Chowdhury)। শুক্রবার দেওয়া তার বিবৃতিতে আর্থিক খাতে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার আর্থিক পরিস্থিতির দিকও তুলে ধরেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, গত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাট দেশের অর্থনীতিকে কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রই নয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও অকার্যকর করে ফেলা হয়েছে। তার ভাষায়, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে হুন্ডি প্রবাহ বেড়েছে এবং ব্যাপক অর্থ পাচারের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ২০ বিলিয়নে নেমে আসে।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, এই সময়ে রপ্তানি কিছুটা বেড়েছে, আমদানি প্রবৃদ্ধি কমেছে এবং প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তার মতে, বিগত সরকারের আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেমিট্যান্স প্রবাহ অন্তর্বর্তী সময়ে পুনরুদ্ধার না হলে বর্তমান সরকারের জন্য অর্থনীতি সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ত। কারণ দায়িত্ব গ্রহণের সময় সব অর্থনৈতিক সূচকই নিম্নমুখী ছিল।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে ভাতা দেওয়া হলেও তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয় করা হয়নি। ফলে প্রকৃত উপকারভোগীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং বৈষম্য বেড়েছে। উপকারভোগী নির্বাচনে দলীয়করণ ও দুর্নীতির অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর ঘাটতির কারণে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটেছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। বাজার সিন্ডিকেট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং দুর্নীতির ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে।
সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী গৃহীত পদক্ষেপগুলোর কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমান সরকার দক্ষ ঋণ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ঘাটতি অর্থায়নে সহজ শর্তে বৈদেশিক উৎস ও মূলধন বাজার উন্নয়নের দিকে নজর দিচ্ছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পে রাজস্ব খাত থেকে অর্থায়ন বাড়িয়ে ঋণনির্ভরতা কমানো এবং জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ-জিডিপি অনুপাত কমিয়ে আনার পরিকল্পনার কথাও বলেন।
পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কাঠামোগত সংস্কার নেওয়া হয়েছে বলে জানান। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (Bangladesh Securities and Exchange Commission)-কে প্রকৃত স্বাধীনতা দেওয়ার পাশাপাশি বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গত ১৫ বছরের অনিয়ম তদন্তে বিশেষ কমিশন গঠনের কথাও বলেন তিনি।
দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগ ও রাজস্বের স্বাভাবিক চক্র সচল করার মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবশেষে তিনি বলেন, জনগণের আস্থার প্রতিফলন ঘটানোই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য—এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই তারা কাজ করে যাবে।
