মিয়ানমারে গ্রাহক তথ্য ফাঁসের অভিযোগে টেলিনরের বিরুদ্ধে ১৩ মিলিয়ন ডলারের যৌথ মামলা

মিয়ানমারের গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্য সামরিক জান্তার হাতে তুলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে নরওয়ের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিকম প্রতিষ্ঠান টেলিনর (Telenor)-এর বিরুদ্ধে যৌথ দেওয়ানি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে প্রায় ১৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিসরে বড় ধরনের আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন তুলেছে।

গত বুধবার (৮ এপ্রিল) সুইডিশ অলাভজনক সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইনিশিয়েটিভ (Justice and Accountability Initiative – JAI) নরওয়েতে এই ক্লাস অ্যাকশন মামলা দায়ের করে। সংস্থাটির অভিযোগ, টেলিনর মিয়ানমারের গ্রাহকদের সংবেদনশীল তথ্য সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ সুগম করেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওপেন সোসাইটি জাস্টিস ইনিশিয়েটিভ (Open Society Justice Initiative – OSJI) এই আইনি পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছে। তাদের মতে, জান্তা সরকারের কাছে তথ্য সরবরাহের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর টেলিনর ব্যবহারকারীদের কল লগ, লোকেশন ডেটা, নাম, ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর এবং মোবাইল নম্বরের সঙ্গে যুক্ত ফেসবুক ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য জান্তার হাতে তুলে দেওয়া হয়। এসব তথ্য ব্যবহার করে বিরোধী মতাবলম্বীদের গ্রেপ্তার, নি’\র্যা’\তন এমনকি মৃ’\ত্যু’\দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

বাদীপক্ষের দাবি, মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা সম্পর্কে টেলিনরের নিজস্ব ঝুঁকি মূল্যায়ন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্তত ১ হাজার ২৫৩টি ফোন নম্বরের তথ্য জান্তার কাছে সরবরাহ করেছে। এই ঘটনাকে তারা ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এই মামলায় প্রতি গ্রাহকের জন্য প্রায় ৯ হাজার ইউরো ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ মিলিয়ন ইউরো, যা প্রায় ১২ দশমিক ৮৭ মিলিয়ন ডলারের সমান।

জেএআই-এর চেয়ারম্যান কো ইয়ে বলেন, “আমরা শুধু কয়েকজন নয়, পুরো ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পক্ষে টেলিনরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে চাই। এই মামলা একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।”

মামলায় নির্দিষ্ট কয়েকজন ভুক্তভোগীর ঘটনাও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ২০২২ সালে মৃ’\ত্যু’\দণ্ড কার্যকর হওয়া র‍্যাপার ও সংসদ সদস্য ফিউ জেয়া থ’ (Phyo Zeya Thaw)। অভিযোগ অনুযায়ী, তার ফোনের তথ্য ২০২১ সালের অক্টোবরে জান্তার হাতে পৌঁছায় এবং দুই সপ্তাহের মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এছাড়া রাজনৈতিক কর্মী অং থু-র ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি মুক্তির পর পুনরায় গ্রেপ্তার হন তথ্য ফাঁসের অভিযোগে—যা মামলার যুক্তিকে আরও জোরালো করেছে।

পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, টেলিনর ২০২২ সালের মার্চে তাদের মিয়ানমার কার্যক্রম ইনভেস্টকম পিটিই লিমিটেড (Investcom Pte Ltd)-এর কাছে বিক্রি করে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিয়ানমারের জান্তা-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল।

এদিকে, জাস্টিস ফর মিয়ানমার (Justice for Myanmar) এবং আইসিজে নরওয়ে টেলিনরের বিরুদ্ধে পৃথকভাবে ফৌজদারি অভিযোগও দায়ের করেছে। পাশাপাশি পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে নরওয়ের পার্লামেন্ট, যা এই ঘটনার আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।