বাংলা প্রবাদেই আছে ‘চৈত্রের খরতাপ’ আর ‘জ্যৈষ্ঠের তাপদাহ’—এই কথাগুলোই যেন প্রতি বছর নতুন করে বাস্তব হয়ে ওঠে। বাংলা পঞ্জিকার চৈত্র, বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ—এই তিন মাসজুড়েই গরমের প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। কাগজে-কলমে গ্রীষ্মকাল শুরু হয় বৈশাখ থেকে, কিন্তু বাস্তবে মার্চ মাস তথা চৈত্র থেকেই তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করে, যা অনেক সময় শরৎকাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়।
এ বছর মার্চ মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির কারণে গরমের তীব্রতা কিছুটা কম অনুভূত হলেও এপ্রিলের শুরুতেই, বিশেষ করে বৈশাখের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে তাপপ্রবাহের দাপট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকতে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এপ্রিল মাসই সবচেয়ে উষ্ণ সময়। সাধারণত এই মাসে গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মে মাসে তা কিছুটা কমে ৩২.৯ ডিগ্রি এবং মার্চে ৩১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকে। এই পরিসংখ্যান ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরের গড় তাপমাত্রার ভিত্তিতে নির্ধারিত।
আবহাওয়াবিদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, চলতি এপ্রিল মাসে তাপমাত্রা মোটামুটি স্বাভাবিক সীমার মধ্যেই থাকতে পারে। তবে তাপপ্রবাহের সময় দেশের কিছু অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের কিছু এলাকায় এই উচ্চ তাপমাত্রা দেখা যেতে পারে।
পহেলা বৈশাখের পরপরই ১৫ এপ্রিলের ২৪ ঘণ্টার রেকর্ডে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৯.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছিল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সারাদেশে দুই থেকে চারটি মৃদু এবং এক থেকে দুইটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ সময় চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী, বদলগাছী ও রাজশাহীর মতো এলাকাগুলোতে তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে দেশে ছয় থেকে আটটি মৃদু এবং তিন থেকে চারটি তীব্র তাপপ্রবাহ হতে পারে। তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা মৃদু, ৩৮ থেকে ৪০ হলে মাঝারি এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তা তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আগে মার্চ থেকে মে মাসকে তাপপ্রবাহের সময় ধরা হলেও এখন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে তা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ফলে বর্ষাকালেও গরমের তীব্রতা পুরোপুরি কমে না—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে কিছুটা স্বস্তির খবরও রয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, এ বছর গরম পড়লেও ২০২৪ সালের মতো চরম তাপপ্রবাহ নাও হতে পারে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, এ বছর বজ্রঝড়ের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হতে পারে। সাধারণত এপ্রিল মাসে গড়ে নয় দিন এবং মে মাসে প্রায় ১৩ দিন বজ্রঝড় হয়ে থাকে।
আবুল কালাম মল্লিক ব্যাখ্যা করেন, প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আগত পূবালী বাতাস বঙ্গোপসাগরে প্রবেশের সময় এর গতি তুলনামূলক বেশি থাকায় সাগরের পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৬ থেকে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে। এতে বাষ্পীভবন বাড়ে এবং বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যা বজ্রবৃষ্টি সৃষ্টিতে সহায়ক।
তিনি আরও বলেন, জলীয় বাষ্প বেশি হলে তা উপরে উঠে মেঘ তৈরি করে এবং বজ্রসহ বৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ‘এল নিনো’সহ বৈশ্বিক আবহাওয়াগত প্রভাবও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। বজ্রঝড় হলে স্বাভাবিকভাবেই তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে গিয়ে স্বস্তি ফিরে আসে।
এদিকে, মার্চ ও এপ্রিলের শুরুতে টানা ঝড়-বৃষ্টির কারণে দেশের তাপমাত্রা হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি কমে গিয়েছিল, যা অনেকের কাছে সাময়িক শীতল আবহাওয়ার অনুভূতি তৈরি করেছিল। আবহাওয়াবিদদের মতে, এই ধরনের পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক নয়—প্রতিবছরই এমন ওঠানামা দেখা যায়।
তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে এই প্রাকৃতিক চক্রে সময়ের কিছুটা হেরফের হচ্ছে। ফলে তাপপ্রবাহ ও বজ্রঝড়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি আগের মতো নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সর্বশেষ ১২০ ঘণ্টার পূর্বাভাসে আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিনে দিন ও রাতের তাপমাত্রা আরও বাড়তে পারে। যদিও রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ায় চলমান মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা হাওয়া, বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
