দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রতিদিনই লম্বা হচ্ছে যানবাহনের সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও জ্বালানি তেল না পাওয়ার অভিযোগ এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। অথচ সরকারের দাবি, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ পরিমাণ পরিশোধিত জ্বালানির মজুত রয়েছে। বাস্তবতা আর সরকারি তথ্যের এই বিপরীত চিত্র ঘিরেই বড় প্রশ্ন—তাহলে তেল যাচ্ছে কোথায়?
এই পরিস্থিতিতে সামনে আসছে অবৈধ মজুত ও ‘প্যানিক বাইং’-এর বিষয়টি। পাশাপাশি অভিযোগ উঠছে, সুযোগ বুঝে তৈরি হয়েছে একদল ‘মৌসুমি ব্যবসায়ী’, যারা পাম্প থেকে তেল কিনে দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছে খোলা বাজারে।
বাগেরহাটের বাসিন্দা প্রহ্লাদ দে জানান, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। তার ভাষায়, “এখন এটা অনেকের ব্যবসা হয়ে গেছে। সকালে বাইক নিয়ে বের হয়, সারাদিন পাম্পে ঘোরে, তারপর এলাকায় গিয়ে ১২০ টাকার তেল ২২০-২৫০ টাকায় বিক্রি করে।”
মাগুরার মোটরসাইকেল চালক আবু সাঈদ রাজিবের অভিযোগ, পাম্পগুলোতে লাইনে দাঁড়ানো নিয়েও চলছে নানা অনিয়ম। “পুলিশ থাকলেও তেমন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। স্থানীয় অনেকেই নিয়ম মানে না,” বলেন তিনি।
রাজশাহীর প্রাইভেটকার চালক আব্দুল কাদেরের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তার অভিযোগ, প্রভাব খাটানো কিংবা ঘুষ দিয়ে লাইনে না দাঁড়িয়ে তেল নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে নিয়ম মেনে দাঁড়ানো মানুষ পড়ছেন দুর্ভোগে।
সরকার বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা, ট্যাগ অফিসার নিয়োগসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, জরুরি পরিস্থিতিতে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাই এই সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে।
সরকারি হিসেব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে এক লাখ এক হাজার ৩৮৫ মেট্রিক টন ডিজেল মজুত রয়েছে। পাশাপাশি ৩১ হাজার ৮২১ মেট্রিক টন অকটেন, ১৮ হাজার ২১১ মেট্রিক টন পেট্রোল, ৭৭ হাজার ৫৪৬ মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল এবং ১৮ হাজার ২২৩ মেট্রিক টন জেট ফুয়েল মজুত আছে। আরও কয়েকটি জাহাজ জ্বালানি নিয়ে দেশে পৌঁছানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (Eastern Refinery Limited) পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দাবি করেন, “এখন দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ জ্বালানি মজুত রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসের চাহিদা পূরণে আমাদের পূর্ণ সক্ষমতা আছে।”
তবুও বাস্তবতা ভিন্ন। ফিলিং স্টেশনে কমছে না ভিড়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ (Iqbal Hasan Mahmud) বলেন, সরকার চাহিদার তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি তেল সরবরাহ করছে। “সংকট নেই, তবুও মানুষ কেন আতঙ্কিত হয়ে বাড়তি তেল কিনছে—এই প্রশ্ন আমাদেরও,” বলেন তিনি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে নয় হাজারের বেশি অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ ৪২ হাজার লিটার অবৈধভাবে মজুত করা জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে এক কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
তবুও বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে কিছুটা চাপ থাকলেও মূল সমস্যা হচ্ছে মানুষের আস্থাহীনতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য ও অপতথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ (Anu Muhammad) বলেন, “মানুষের ভোগান্তির সঙ্গে সরকারের পদক্ষেপের মিল নেই। কেন মানুষ সরকারি তথ্যে আস্থা পাচ্ছে না, সেটি খতিয়ে দেখা জরুরি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম (Badrul Imam) মনে করেন, “পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও এমন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। ব্যবস্থাপনায় কোথাও না কোথাও সমস্যা রয়েছে, সেটি সরকারকেই চিহ্নিত করতে হবে।”
সব মিলিয়ে, জ্বালানি তেল নিয়ে তৈরি হওয়া এই অস্থিরতায় একদিকে যেমন প্যানিক বাইং বাড়ছে, অন্যদিকে সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র। ফলে মজুত থাকলেও বাজারে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট—যার ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
