দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও বিতরণ ঘিরে নতুন করে এক জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। একদিকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না ভোক্তারা, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ট্যাংকারে পেট্রোল ও অকটেন উপচে পড়ছে। এই দ্বৈত চিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (Bangladesh Petroleum Corporation)—সংক্ষেপে বিপিসি—যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা দেশীয় কোম্পানির তেল গ্রহণ করছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, দেশের মোট পেট্রোল ও অকটেন চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ পূরণ করে স্থানীয় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান—এর মধ্যে চারটি বেসরকারি এবং একটি সরকারি। মাসিক চাহিদা প্রায় ৭৫ হাজার টন। এই সরবরাহের বড় অংশই আসে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি (Super Petrochemical PLC) থেকে, যা একাই প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ জোগান দেয়।
তবে গত ৮ এপ্রিল বিপিসি ওই প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে তাদের কাছ থেকে তেল না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির ট্যাংকারগুলো এখন ধারণক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে, আর উৎপাদন কার্যক্রমও হুমকির মুখে পড়েছে।
এদিকে, দেশের বিভিন্ন জেলায় পাম্পে ১ থেকে ২ কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই ভোগান্তির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) একাধিক বৈঠক করেছেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। তিনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি খাতে কোনো অব্যবস্থাপনা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন।
সংখ্যার হিসাব বলছে, দেশে অকটেন সংরক্ষণের সক্ষমতা ৫৩ হাজার টন হলেও বর্তমানে মজুত রয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার টন। এর মধ্যেই ১০ এপ্রিল আরও ৩৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ দেশে পৌঁছায়, যা পরিস্থিতিকে আরও চাপে ফেলে।
১৬ এপ্রিল বিপিসির চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণব কুমার সাহা জানান, ৫ এপ্রিলের বৈঠকে তাদের এপ্রিলে ৩৭ হাজার টন পেট্রোল-অকটেন এবং ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। কিন্তু ৮ এপ্রিল থেকে বিতরণ কোম্পানিগুলো তেল গ্রহণ বন্ধ করে দেয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ফেব্রুয়ারিতে একটি জাহাজ আসার পরও বিপিসি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তেল নেয়নি, ফলে মার্চ মাসে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। এখন ২০ এপ্রিল কাঁচামাল নিয়ে আরেকটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, কিন্তু ট্যাংক খালি না হলে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
অন্যদিকে, মেঘনা পেট্রোলিয়াম (Meghna Petroleum)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসান জানান, অকটেন সংরক্ষণের আর জায়গা নেই। তাই বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে সীমিত পরিমাণে তেল নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—এই তিনটি বিতরণ কোম্পানি প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার ৭৭৭ টন ডিজেল, ১ হাজার ৪৯৬ টন পেট্রোল এবং ১ হাজার ১৯৩ টন অকটেন সরবরাহ করছে। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর ৮ মার্চ থেকে সরকার তেল সরবরাহে রেশনিং চালু করে। ঈদের আগে সেটি তুলে নেওয়া হলেও সরবরাহ সীমিত রাখার নির্দেশনা বহাল রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সীমিত সরবরাহের কারণে বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং মজুতদারির প্রবণতাও বেড়েছে। ফলে পাম্পে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দেশীয় উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও তা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হচ্ছে, এবং এর দায় কে নেবে?
এই বৈপরীত্যই এখন জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
