রাজধানীর মোহাম্মদপুর এখন ভয়াবহ অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযান সত্ত্বেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এখন যেন এক আতঙ্কের নাম। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর কিশোর গ্যাংয়ের প্রকাশ্য আধিপত্যে এই এলাকা রীতিমতো অপরাধের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে এই অঞ্চলে অপরাধের মাত্রা আরও বেড়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন।
প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা, সড়কে অস্ত্রের মহড়া, মাদক কারবার ও গণছিনতাই—সব মিলিয়ে মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় এখন আতঙ্কের পরিবেশ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে অন্তত ২০ থেকে ২৫টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়, যারা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হলেও এলাকার বিভিন্ন অংশে আধিপত্য বিস্তার করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গাংচিল, কব্জি কাটা আনোয়ার, পাটালি গ্রুপ, বাদল, লও ঠেলা, আরমান-শাহরুখ, লাল বাহিনী, বিরিয়ানি সুমন গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, বেলচা মনির, ডায়মন্ড, টুয়েন্টি ফাইভ, মুরগি গ্রুপ, টুন্ডা বাবু, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসানসহ বহু নামধারী গ্রুপ মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয়। এসব গ্রুপের সদস্যরা প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয় এবং সুযোগ পেলেই ছিনতাই ও হামলায় জড়িয়ে পড়ে।
বিশেষ করে মোহাম্মদপুর তিন রাস্তার মোড়, বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান, চন্দ্রিমা হাউজিং, আদাবর, শেখেরটেক, মনসুরাবাদ ও রায়ের বাজার এলাকায় এসব গ্যাংয়ের দাপট সবচেয়ে বেশি বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি রায়ের বাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় দুই কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষে এলেক্স গ্রুপের প্রধান ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়ে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নিহত ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ ১৮টি মামলা ছিল।
অন্যদিকে আরমান-শাহরুখ গ্রুপও একই এলাকায় প্রভাব বিস্তার করত বলে জানা যায়। এই দুই গ্রুপই আবার স্থানীয় প্রভাবশালী অপরাধীদের হয়ে কাজ করত বলে অভিযোগ রয়েছে।
১৫ এপ্রিল রাতে রায়ের বাজার বেড়িবাঁধ এলাকার ইটখোলা এলাকায় আসাদুল ইসলাম ওরফে লম্বু আসাদুলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। তার পরিবার জানায়, এক বন্ধু তাকে ফোন করে ডেকে নেয় এবং এরপরই হত্যাকাণ্ড ঘটে। পরে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ সূত্র বলছে, আসাদুল নিজেও একটি গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মাদক ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগেও মোহাম্মদপুরে একাধিক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। এক সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা ও ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পর্যন্ত ছিনতাই ও হামলার শিকার হয়েছেন। ধারালো অস্ত্রের মুখে মোবাইল, মানিব্যাগ ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চাঁদাবাজির ঘটনাও ভয়াবহ আকার নিয়েছে। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট দোকানদার পর্যন্ত সবাইকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। কোথাও চাঁদা না দিলে দোকান বন্ধ করে দেওয়া বা হামলার ঘটনাও ঘটছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, গত এক বছরে মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রায় তিন হাজার অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে জামিনে বের হয়ে তারা আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ দাবি করছে, অভিযান চলমান রয়েছে এবং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক পুনর্বাসন ও আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি যারা এসব গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে তাদেরও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
সব মিলিয়ে মোহাম্মদপুর এখন শুধু রাজধানীর একটি এলাকা নয়, বরং অপরাধ ও নিরাপত্তাহীনতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি হিসেবে সামনে আসছে।
