লন্ডনে বিলাসবহুল সম্পদ, দেশে ঋণের পাহাড়—শওকত আজিজ রাসেলকে ঘিরে জটিল আর্থিক চিত্র

লন্ডনের অভিজাত রিজেন্ট পার্ক (Regent Park)-সংলগ্ন নীরব আবাসিক এলাকায় মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বাড়ি, আর বাংলাদেশে হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি—এই বৈপরীত্যের মধ্যেই সামনে এসেছে আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শওকত আজিজ রাসেলের বিস্তৃত আর্থিক নেটওয়ার্ক। অনুসন্ধানে পাওয়া নথিপত্র বলছে, তার মালিকানাধীন আম্বার ওভারসিজ লিমিটেডের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক ভবন ও বিলাসবহুল আবাসন ব্যবসা। একই সময়ে দেশে একাধিক ব্যাংক থেকে সক্রিয় ও কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া বিপুল ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে তিনি বড় ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, আদালতের স্থগিতাদেশ ও আইনি জটিলতার আড়ালে বছরের পর বছর ব্যাংকগুলোর অর্থ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া থমকে আছে। উল্টো ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

নথিপত্র অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের লন্ডনে রিজেন্ট পার্কের পাশেই একটি বিলাসবহুল বাড়ির মালিক শওকত আজিজ। তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। লন্ডনে নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামেও রয়েছে বিপুল সম্পত্তি। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে ‘আম্বার ওভারসিজ লিমিটেড’ নামে একটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানি গড়ে তোলেন তিনি। কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ০৭৯৩৫৯৬২ এবং অফিসের ঠিকানা ২৮১এ ব্রিক লেন, লন্ডন। ২০১৯ ও ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি নবায়ন করা হয়, এবং শওকত আজিজ একাই এর শতভাগ শেয়ারধারী।

তথ্য অনুযায়ী, আম্বার ওভারসিজের নামে লন্ডনের ২৭৫ বেথনাল গ্রিন রোডে একটি বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন কিনেছেন তিনি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা)। ভবনটি বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং মাসিক ভাড়া থেকে আয় হচ্ছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। ভবনের নিচতলা টেসকো এক্সপ্রেস (Tesco Express)-এর কাছে ভাড়া দেওয়া রয়েছে। এছাড়া লন্ডনের ৩৩ চেস্টার ক্লোজ নর্থ রোডে আরও একটি আবাসিক বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৩ মিলিয়ন পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা)। এর একটি অংশে তার পরিবার বসবাস করে, বাকি অংশ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আরও কয়েকটি সম্পদের তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ নথি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা এম এ হাশেম (M A Hashem)-এর সন্তান শওকত আজিজ রাসেল উত্তরাধিকারসূত্রে ‘আম্বার’ অংশটি পান। গ্রুপটির অধীনে বস্ত্র, সুতা, পার্টিকেল বোর্ড, কাগজ ও পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি নতুন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেও সেগুলোর অনেকগুলোর কার্যক্রম সক্রিয় নয়, যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ঋণ রয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লন্ডনে এসব সম্পত্তি কেনা হয়। ওই সময় দেশের একাধিক ব্যাংক থেকে বিপুল ঋণ নেওয়া হয়—যার একটি অংশ নেওয়া হয় এমন প্রতিষ্ঠানের নামে, যেগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব নেই। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক থেকে নেওয়া এসব ঋণের অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিয়ে লন্ডনে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও সক্রিয় হয়ে বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নথিপত্র বলছে, বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি ১৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১ হাজার ৩৪৩ কোটির বেশি ঋণ নেন তিনি। এর মধ্যে ৫২১ কোটি টাকা বকেয়া হয়ে গেলে তা আর পরিশোধ করতে পারেননি। বর্তমানে মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। বড় ঋণখেলাপি হওয়ার পর ব্যাংকগুলো চাপ সৃষ্টি করলে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ নিয়ে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া আটকে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের স্টে অর্ডার বাতিল হলেও প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে ব্যাংকগুলো কার্যকরভাবে এগোতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গত বছর ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (UCB)-সংক্রান্ত একটি রিটে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়ায় আদালত শওকত আজিজসহ ছয়জন শেয়ারহোল্ডারকে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করে।

একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, অতীতের মতো এখনও কিছু ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি ও দুর্নীতিপ্রবণ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আম্বার গ্রুপের ব্যবসার আকারের তুলনায় ঋণের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চাপ তৈরি হয়েছে। ডেনিম ও কটন মিলগুলো বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে, ফলে ঋণের কিস্তি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। নগদ প্রবাহের তুলনায় দেনার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়ছে। ইতোমধ্যে কিছু কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে, আর কিছু কেবল কাগজে-কলমে টিকে আছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি টাস্কফোর্সের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে তা কার্যকর করতে সীমাবদ্ধতা থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চাইলে তা বাতিলের আবেদন করতে পারে।

এদিকে, গাজীপুরের শাল-গজারি বন এলাকায় শওকত আজিজের মালিকানাধীন ‘ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা’ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কৌশলে জমি অধিগ্রহণ এবং বনভূমি দখল করে এই রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ (Benazir Ahmed)-এর প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি গাজীপুর জেলা প্রশাসন ওই রিসোর্টে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অবৈধ মদ ও মাদক উদ্ধার করে এবং ছয়জনকে আটক করে। অভিযোগ রয়েছে, রিসোর্টটি নিয়মিত মাদক পার্টির জন্য ভাড়া দেওয়া হতো, যদিও প্রভাবশালী মালিকানার কারণে আগে কোনো অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি।

এছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (BTMA)-এর সভাপতি পদেও নির্বাচন ছাড়াই ২০২৫–২৭ মেয়াদে দায়িত্ব নিয়েছেন শওকত আজিজ রাসেল। এর আগে অভ্যুত্থানের পর আগের সভাপতিকে সরিয়ে নিজেই সেই পদে বসেন।

অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার প্রতিষ্ঠানের একটি নম্বরে যোগাযোগ করলে ফণি ভূষণ সরকার নামে এক ব্যক্তি ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পরিচয়ে জানান, শওকত আজিজের এত ঋণ নেই, বিদেশে তার কোনো সম্পদ নেই এবং তিনি কোনো অর্থ পাচার করেননি।