নতুন সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে ঘিরে দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে ক্রমেই বাড়ছে অসন্তোষ ও ক্ষোভ। এই অস্বস্তির প্রভাব ইতোমধ্যেই প্রশাসনের কার্যক্রমে পড়তে শুরু করেছে—কাজের গতি কমছে, বাড়ছে অনীহা।
বাংলাদেশ সচিবালয় (Bangladesh Secretariat)সহ বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে কর্মরত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত তিনটি কারণে এই অসন্তোষ দানা বাঁধছে।
প্রথমত, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ জমছে। দ্বিতীয়ত, জনপ্রশাসন, শিক্ষা ও স্থানীয় সরকার খাতে বদলি ও পদায়নে যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ায় অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়েছে। তৃতীয়ত, অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে সরকারের কড়াকড়ি নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে চাপ ও অসন্তোষ বাড়াচ্ছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে বর্তমান বেতনে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করছেন কর্মচারীরা। অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন। একইসঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়হীনতা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ার কথাও উঠে এসেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (Ministry of Public Administration)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ ১৯ লাখ ১৯ হাজার ১১১টি। এর মধ্যে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ। ২০২৪-২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কর্মরত রয়েছেন ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন।
সবচেয়ে বেশি শূন্যপদ রয়েছে স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। ২০১৫ সালে সর্বশেষ পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার পর থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর দাবিতে আন্দোলন চলছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান বেতনে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি (Bangladesh Government Officers-Employees Welfare Association) নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচিও পালন করেছে। তাদের প্রধান দাবি—দ্রুত নবম পে-স্কেল ঘোষণা।
অন্যদিকে, ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারির পর থেকে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। ২৫ মে ২০২৫ জারি হওয়া এই অধ্যাদেশকে অনেকেই ‘নিবর্তনমূলক’ বলে অভিহিত করছেন। এতে আন্দোলনে অংশ নিলে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান থাকায় কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে সচিবালয়ে এ অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে মিছিল, বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির ঘটনাও ঘটেছে।
এছাড়া স্থায়ী নিয়োগের বদলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ বাড়ানোয় চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আলোচনা ও পর্যালোচনা কমিটি গঠন করলেও কর্মচারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে।
মাঠপর্যায়ে নতুন অফিস সময়সূচি নিয়েও দেখা দিয়েছে চাপ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিটের মধ্যে অফিসে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেরি হলে ছুটি কর্তনের নির্দেশনা কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা অনেক কর্মচারীর জন্য সময়মতো অফিসে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। আকস্মিক পরিদর্শনের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে বলে জানান তারা।
সচিবালয়ের কর্মচারী সমিতির নেতা আব্দুল খালেক বলেন, নতুন পে-স্কেল এখন সময়ের দাবি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে, যা জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন করে তুলবে।
অন্যদিকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাজবাড়ি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এক কর্মচারী (ছদ্মনাম সিরাজুল ইসলাম) বলেন, নতুন নির্দেশনা বাস্তবতায় পুরোপুরি মানা কঠিন হলেও তা মেনে চলতে হচ্ছে। পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার আরেক কর্মচারী জানান, আকস্মিক পরিদর্শনের ভয়ে সবসময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব জহুরুল ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করতে হবে, তবে অতিরিক্ত কড়াকড়ি কোনো ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।
