জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে উঠেছে। ছাত্র-জনতার এক দফা দাবির ভিত্তিতে ১৫ বছরের জেঁকে বসা ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ঘটে, যা কেবল একটি সরকারের বিদায় নয়—বরং বৈষম্যহীন নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ ছিল।
তবে সেই গণঅভ্যুত্থানের পর দেড় বছরেরও বেশি সময় পার হলেও দেশে ‘পুরোনো বন্দোবস্ত’ বহাল রাখার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে অভিযোগ করেছেন নাহিদ ইসলাম (Nahid Islam), জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি (NCP)-এর আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য। একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকারে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে কঠোর ভাষায় বিশ্লেষণ করেছেন।
তার মতে, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে আমলাতন্ত্র—প্রায় সব ক্ষেত্রেই একটি অদৃশ্য ক্ষমতা বলয় বা ‘ডিপ স্টেট’ সক্রিয়। আওয়ামী লীগ আমলের সুবিধাভোগী আমলা, ব্যবসায়ী ও মাফিয়া গোষ্ঠী এখনও নতুন ব্যবস্থার ভেতরে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। ফলে যে মৌলিক রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশায় মানুষ রক্ত দিয়েছে, তা আজ সংকটের মুখে।
ডিপ স্টেটের অদৃশ্য প্রভাব
নাহিদ ইসলাম বলেন, এনসিপির রাজনৈতিক যাত্রা মূলত জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকেই শুরু। ফেব্রুয়ারিতে দলটির এক বছর পূর্ণ হলেও এই স্বল্প সময়ে তারা নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘নতুন দল হিসেবে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছয়টি আসনে জয় এবং তিন শতাংশ ভোট পাওয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।’
তবে তিনি অভিযোগ করেন, পুরোনো রাজনৈতিক শক্তি এবং তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ কখনোই নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান মেনে নিতে চায়নি। তারা ধারাবাহিকভাবে এনসিপি ও ছাত্র আন্দোলনের সংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে।
তার ব্যাখ্যায়, এই ‘ডিপ স্টেট’ গঠিত হয় আমলাতন্ত্র, সেনাবাহিনী, ব্যবসায়ী এলিট, মাফিয়া গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক পরাশক্তির সমন্বয়ে। এই বলয় দৃশ্যমান সরকারের আড়ালে থেকেও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়।
তিনি বলেন, ‘যারা আগে সুবিধাভোগী ছিল, তারা এখনো সেই সুবিধা ধরে রাখতে চায়। কোনো সংস্কার হলে তাদের লুটপাটের সুযোগ কমে যাবে—তাই তারা সংস্কারের বিরোধিতা করছে।’
সংস্কার প্রশ্নে দ্বন্দ্ব
রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল (BNP)-এর সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিএনপি এই অভ্যুত্থানকে শুধুমাত্র শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন হিসেবে দেখে, কিন্তু এনসিপি এটিকে রাষ্ট্র সংস্কারের বৃহত্তর প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি সংস্কারের বিষয়ে অনাগ্রহী এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যেতে চায়। আন্দোলনের সময় চাপের মুখে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে এখন তারা সরে আসছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে গণভোটের প্রশ্নে নীরবতা ও তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর অবস্থানকে তিনি রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে আখ্যা দেন।
বিচার বিভাগের ভারসাম্যহীনতা
নাহিদ ইসলাম বলেন, একটি আধুনিক রাষ্ট্রে নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। কিন্তু বর্তমানে সংসদকে সর্বময় ক্ষমতার উৎস হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে।
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ যেমন বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল, বিএনপিও একই পথে হাঁটছে। বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয়ের প্রস্তাবগুলোও উপেক্ষিত হচ্ছে। এমনকি মানবাধিকার কমিশনকে কার্যত অকার্যকর করে রাখা হয়েছে পুরোনো আইনের অজুহাতে—যে আইন বহাল থাকাকালেই গু’\ম ও খু’\নসহ নানা গুরুতর ঘটনা ঘটেছে।
গণমাধ্যমে নতুন করে নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা
গণমাধ্যম নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এখনো গণমাধ্যম খাতে বিনিয়োগ করছে এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ফ্যাসিস্ট আমলের দোসররা আবারও বিভিন্ন মিডিয়া হাউসে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এর ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা সাংবাদিকদের ছাঁটাই করা হচ্ছে।
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গণমাধ্যম তুলনামূলক স্বাধীন থাকলেও এখন আবার পুরোনো চক্র ফিরে আসছে। সংবাদপত্র ও টেলিভিশনগুলো আবারও সরকারের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যার ফলে সেন্সরশিপের পুরোনো চিত্র ফিরে আসার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে ডিজিটাল মিডিয়ার কিছু নতুন উদ্যোগ তাকে আশাবাদী করেছে।
তরুণদের জন্য নতুন রাজনৈতিক ক্ষেত্র
এনসিপিতে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সমালোচনার জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান তরুণদের চিন্তায় বড় পরিবর্তন এনেছে। অনেকেই এখন স্বচ্ছ রাজনীতির সন্ধানে রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠিত দলগুলোতে দীর্ঘ সময় রাজনীতি করেও তরুণরা প্রাপ্য জায়গা পায় না। এনসিপি সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। তবে দলে যোগ দিতে হলে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দর্শনের সঙ্গে একমত হওয়া এবং পরিষ্কার অতীত থাকা বাধ্যতামূলক।
পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
পররাষ্ট্রনীতিতে সরকারের অবস্থানকে দুর্বল বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে সরকারের অবস্থানকে ‘অস্বচ্ছ’ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ভারত দীর্ঘদিন বাংলাদেশে ফ্যাসিজমকে মদত দিয়েছে এবং এখনো অভিযুক্তদের আশ্রয় দিচ্ছে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা মর্যাদাহানিকর বলে মনে করেন তিনি।
একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সরকারের অবস্থানকে ‘পরাশক্তি নির্ভর’ বলেও সমালোচনা করেন।
ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও ‘অলিগার্ক’ প্রভাব
ব্যাংকিং খাতে চলমান বিশৃঙ্খলা নিয়েও তিনি তীব্র সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, সরকার ব্যাংক লুটপাটকারীদের রক্ষা করছে এবং ঋণ খেলাপিদের প্রভাব বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি, দাবি করেন—এখানে ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিদের বসানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে গড়ে ওঠা ‘অলিগার্ক মাফিয়াতন্ত্র’ ভাঙার বদলে সেটিকে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নিয়ে বিতর্ক
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তার মতে, সরকার এই প্রতিষ্ঠানটিকেও দলীয়করণের আওতায় আনতে চাইছে।
তিনি বলেন, পূর্বের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরিচালনার কথা থাকলেও নতুন সংশোধনীতে মন্ত্রীকে প্রধান করা হয়েছে। এতে জাদুঘরের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তার আশঙ্কা, সরকার হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে জাদুঘরের উদ্বোধন বিলম্বিত করছে, যাতে অভ্যুত্থানের ইতিহাস দলীয়ভাবে উপস্থাপন করা যায়।
সামনের পথে সতর্কবার্তা
সাক্ষাৎকারের শেষদিকে বিএনপি সরকারের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, জনগণ আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হতে পারে যদি সংস্কারের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তার মতে, সরকার ইতোমধ্যেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে—তেল সংকট, নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
তিনি জানান, এনসিপি ও ১১ দলীয় জোট ধাপে ধাপে জনমত গঠন করছে এবং প্রয়োজন হলে তারা রাজপথে আন্দোলনে নামবে।
সব মিলিয়ে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো টিকে থাকবে, নাকি নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর পথে যাত্রা শুরু হবে—সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।
