তনু হ’\ত্যা মামলার ময়নাতদন্ত বিতর্কে ডা. কামদা প্রসাদ সাহার বক্তব্য: ‘চরিত্রহনন আর হুমকিতে বিপর্যস্ত আমি’

২০১৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হ’\ত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ঘিরে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নতুন করে সামনে আসতেই এবার বিস্তারিতভাবে নিজের অবস্থান তুলে ধরলেন ডা. কামদা প্রসাদ সাহা।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন প্রধান এবং দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই চিকিৎসক সোমবার (২৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি দীর্ঘ বিবৃতিতে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সমালোচনা এবং দেশত্যাগের গুঞ্জনের জবাব দেন।

সম্প্রতি তনু হ’\ত্যা মামলায় সন্দেহভাজন একজনকে গ্রেপ্তারের পর তার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠলে তিনি এসব আলোচনাকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘চরিত্রহননমূলক’ বলে আখ্যা দেন। নিজের বক্তব্যে তিনি জানান, গত কিছুদিন ধরে প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে ঘিরে যে অপপ্রচার চলছে, তা তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।

তিনি লিখেছেন, ‘যথেচ্ছ গালাগালি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, হ’\ত্যার হুমকি, চরিত্রহনন—একজন মানুষকে ধ্বংস করার যত উপায় আছে, তার প্রায় সবই আমাকে অকারণে সহ্য করতে হচ্ছে।’ কেন তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে—এই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

প্রথম ময়নাতদন্ত প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ওই প্রক্রিয়ার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। সেটি সম্পন্ন করেছিলেন ফরেনসিক বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক শিক্ষক। পরে আদালতের নির্দেশে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ বোর্ড গঠন করা হলে, তিনি সেই বোর্ডের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান এবং প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন।

দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের সীমাবদ্ধতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, গরম আবহাওয়ায় এতদিন পর কবর থেকে উত্তোলিত লাশ অনেকটাই পচে গিয়েছিল। ফলে ডিকম্পোজড বডি থেকে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তিনি এটিকে সম্পূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত বাস্তবতা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

তবে তিনি জানান, দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে সিআইডির মাধ্যমে তনুর পোশাকে তিনজন পুরুষের শুক্রাণুর ডিএনএ পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে ভুল ব্যাখ্যার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, রিপোর্টে কোথাও তনুর চরিত্র নিয়ে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়নি। বরং অনেকেই তিনজনের ডিএনএ পাওয়ার বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষায়, ‘ওই রিপোর্টে কোথাও বলা হয়নি যে তনু ইচ্ছাকৃতভাবে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সংসর্গ করেছিল। কিন্তু মানুষ হয়তো আবেগের বশে নিজেদের মতো করে বিষয়টি কল্পনা করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ফরেনসিক রিপোর্ট সাধারণ মানুষের বোঝার বিষয় নয়, ফলে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভুল ব্যাখ্যার দায় এককভাবে তার ওপর চাপানো হচ্ছে, যা অন্যায়।

তদন্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্তকারী সংস্থা যদি আসামিদের শনাক্ত করতে পারে এবং আদালত বিচার সম্পন্ন করে, তাহলে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট কখনোই বাধা নয়; বরং সহায়ক হিসেবেই কাজ করবে।

দেশত্যাগের গুঞ্জন প্রসঙ্গে ডা. সাহা স্পষ্টভাবে জানান, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে যে খবর ছড়ানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আমি কী কোনো অপরাধ করেছি? আমি তো শুধু একজন চিকিৎসক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করেছি। তাহলে আমি দেশ ছেড়ে পালাব কেন?’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলমান ‘মব ট্রায়াল’ এবং অপপ্রচারের কারণে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

শেষদিকে সাধারণ মানুষের প্রতি প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, তার দেওয়া সব বক্তব্যই আইনগতভাবে নথিভুক্ত এবং যাচাইযোগ্য—তবুও কেন তাকে এককভাবে টার্গেট করা হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ উদ্ধারের পর দীর্ঘ এক দশকেও এই মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বর্তমানে মামলাটি পিবিআই তদন্ত করছে এবং তিনজনের ডিএনএ মিলানোর প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এই মামলায় সাবেক ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া ডিএনএ পাওয়া অন্য দুজন হলেন সাবেক সার্জেন্ট জাহিদ এবং সাবেক সৈনিক শাহিনুল আলম।