সমালোচকদের নেতিবাচক রিভিউ, জটিল নির্মাণপ্রক্রিয়া এবং পুরনো বিতর্ক—সবকিছুকে পেছনে ফেলে বক্স অফিসে দুর্দান্ত যাত্রা শুরু করেছে মাইকেল জ্যাকসনের জীবনভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘মাইকেল’। বড় বাজেটের এই ছবিটি উত্তর আমেরিকায় মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই আয় করেছে ৯৭ মিলিয়ন ডলার। আর বিশ্বব্যাপী এর মোট আয় দাঁড়িয়েছে ২১৭ মিলিয়ন ডলার—যা ইতিহাসে কোনো বায়োপিকের সর্বোচ্চ উদ্বোধনী আয় হিসেবে নতুন রেকর্ড গড়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
মাইকেল জ্যাকসনের ভাগ্নে জাফার জ্যাকসন (Jaafar Jackson) অভিনীত এই ছবিটি আন্তর্জাতিক বাজারেও দেখিয়েছে শক্ত অবস্থান। উত্তর আমেরিকার বাইরে আয় করেছে ১২০.৪ মিলিয়ন ডলার। এর মাধ্যমে ২০২৩ সালের ওপেনহেইমার (Oppenheimer) এবং ২০১৮ সালের বোহেমিয়ান র্যাপসোডি (Bohemian Rhapsody)-এর উদ্বোধনী আয়ের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে ছবিটি।
শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই নয়, উত্তর আমেরিকাতেও এটি নতুন ইতিহাস গড়েছে। ওপেনহেইমার, স্ট্রেট আউটা কম্পটন এবং বোহেমিয়ান র্যাপসোডির মতো জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের উদ্বোধনী আয়কে ছাড়িয়ে গেছে ‘মাইকেল’।
তবে বাণিজ্যিক সাফল্যের এই গল্পের ভেতরে রয়েছে সমালোচনার ছায়াও। অনেক সমালোচক অভিযোগ তুলেছেন, ছবিটি জ্যাকসনের জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলো যথাযথভাবে তুলে ধরেনি। রোটেন টমেটোসে ছবিটির সমালোচক স্কোর যেখানে মাত্র ৩৮%, সেখানে দর্শকদের রেটিং ৯৭%—যা দর্শকপ্রিয়তার দিকটি স্পষ্ট করে।
এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিজেই ছিল একটি বড় ঝুঁকি। লায়ন্সগেট (Lionsgate) একটি বিতর্কিত ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে এমন বড় বাজেটের প্রকল্প হাতে নেয়, যার জীবন একাধিকবার বিতর্কে জড়িয়েছে। ২০০৯ সালে ৫০ বছর বয়সে মারা যাওয়া মাইকেল জ্যাকসন (Michael Jackson)-এর বিরুদ্ধে শিশুদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। যদিও জ্যাকসন ও তার এস্টেট সবসময়ই তার নির্দোষিতা দাবি করেছে, তবুও অন্যের সন্তানদের সঙ্গে একই শয়নকক্ষে থাকার বিষয়টি তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন। ২০০৫ সালে তার একমাত্র ফৌজদারি মামলায় তিনি খালাস পান।
পরিবারের ভেতরেও এই চলচ্চিত্র নিয়ে দ্বিমত ছিল। তার বোন জ্যানেট জ্যাকসন (Janet Jackson) এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, এমনকি এতে উপস্থিতও হননি। অন্যদিকে কন্যা প্যারিস জ্যাকসন ছবিটিকে ‘কল্পনার জগৎ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
নির্মাণ প্রক্রিয়াটিও ছিল নাটকীয় ও জটিল। শুটিং শেষে জানা যায়, ছবির একটি বড় অংশে জর্ডান চ্যান্ডলার সংক্রান্ত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, যা আইনি জটিলতার কারণে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
চলচ্চিত্রের তৃতীয় অংশে তৎকালীন ১৩ বছর বয়সী জর্ডান চ্যান্ডলারের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছিল, যাকে ১৯৯৪ সালের একটি মীমাংসায় ২৩ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই মীমাংসার শর্ত অনুযায়ী, জ্যাকসন এস্টেট কোনো চলচ্চিত্রে চ্যান্ডলারের নাম উল্লেখ করতে পারবে না। ফলে নির্মাতাদের প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পুনরায় শুটিং করতে হয় এবং গল্পের সময়সীমা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়—অর্থাৎ অভিযোগ ওঠার আগের সময় পর্যন্ত।
প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক পরিবেশনার অধিকার ইউনিভার্সাল (Universal Pictures)-এর কাছে বিক্রি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ছবিটির সাফল্যের ধারাবাহিকতায় সিক্যুয়েল তৈরির পরিকল্পনাও শুরু হয়েছে, এমনকি তৃতীয় কিস্তি নিয়েও ভাবছেন প্রযোজকরা।
উল্লেখ্য, এখনো জাপানে ছবিটি মুক্তি পায়নি—যেখানে মাইকেল জ্যাকসনের বিশাল ভক্তগোষ্ঠী রয়েছে। জুন মাসে সেখানে মুক্তির কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে, বিতর্ক আর চ্যালেঞ্জকে পেছনে ফেলে ‘মাইকেল’ এখন বক্স অফিসে এক অপ্রতিরোধ্য সাফল্যের নাম।


