লন্ডনের রাস্তায় কিশোরদের নতুন ‘অস্ত্র’—ই-বাইক আর বালাক্লাভায় বাড়ছে ফোন ছিনতাই

বালাক্লাভা মুখোশ আর ই-বাইক—এই দু’টি জিনিস এখন লন্ডন (London)-এর রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো কিশোরদের জন্য কার্যত ‘অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে। মুহূর্তের মধ্যে অসতর্ক পথচারী, যাত্রী কিংবা পর্যটকদের হাত থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া যেন তাদের কাছে নিত্যদিনের ঘটনা।

একটি রৌদ্রোজ্জ্বল শুক্রবার রাতে বার্তা সংস্থা এএফপি (AFP) যখন পুলিশের টহলে যোগ দেয়, তখন পুলিশ কর্মকর্তা হেইডেন ও’কনর চারপাশে সম্ভাব্য শিকারের দিকে নজর রাখছিলেন। তার ভাষায়, “ধরুন, আপনার বাস আসতে ২০ মিনিট বাকি। আপনি ফোন বের করে ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করছেন। হঠাৎ একটি ই-বাইক এসে চোখের পলকে ফোন নিয়ে উধাও হয়ে যাবে।”

ও’কনর ‘ইন্টারসেপ্টর টিম’-এর সদস্য, যারা চিহ্নহীন গাড়িতে করে শহরজুড়ে টহল দেয়। চুরি হওয়া ফোনের সিগন্যাল অনুসরণ করে তারা চোরদের ধরার চেষ্টা করে। তবে তার সহকর্মী হেইলি কার স্বীকার করেন, একবার ফোন চুরি হয়ে গেলে তা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা “খুবই, খুবই কম।”

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেট্রোপলিটন পুলিশ (Metropolitan Police) ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ইউরোপের ‘ফোন চুরির রাজধানী’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ড্রোন, লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি এবং ইন্টারসেপ্টর টিম ব্যবহার করে জোরালো অভিযান চালানো হচ্ছে, যার কিছু ইতিবাচক ফলও মিলেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে ৮১,৩৬৫টি ফোন চুরি হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১,৩৯১-এ—অর্থাৎ ১২.৩ শতাংশ হ্রাস। ৩১ মার্চ শেষ হওয়া অর্থবছরে প্রায় ১৩,০০০টির কম ফোন চুরি হয়েছে।

অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলের আড়ালে হারিয়ে যায় সিগন্যাল

চুরি হওয়া ফোনগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই বিদেশে পাচার, পুনরায় সক্রিয়করণ এবং বিক্রি করা হয়। সাম্প্রতিক আলোচিত ভুক্তভোগীদের একজন ছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার (Keir Starmer)-এর সাবেক শীর্ষ রাজনৈতিক উপদেষ্টা মরগান ম্যাকসুইনি, যার ফোন অক্টোবরে ছিনতাই হয়।

গত বছর মেট্রোপলিটন পুলিশ একটি আন্তর্জাতিক চক্র ভেঙে দেয়, যারা ব্রিটেন থেকে প্রায় ৪০,০০০ চুরি হওয়া ফোন চীনে পাচার করছিল। ডিটেকটিভ সুপারিনটেনডেন্ট গ্যারেথ গিলবার্ট জানান, “মাত্র এক সপ্তাহেই আমরা ই-বাইক সংশ্লিষ্ট অপরাধ প্রায় ৪০ শতাংশ কমাতে পেরেছি। আমাদের বার্তা পরিষ্কার—অপরাধ করলে ধরা পড়তেই হবে।”

লন্ডন ব্রিজ এলাকায় এক শুক্রবার রাতে টহলের সময় হঠাৎ কন্ট্রোল রুম থেকে খবর আসে—ডেপ্টফোর্ড এলাকায় একটি চুরি হওয়া ফোন ট্র্যাক করা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে আনমার্কড গাড়ির নীল বাতি জ্বলে ওঠে, দ্রুতগতিতে এগোতে থাকে দলটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফোনটির সিগন্যাল হারিয়ে যায়।

পরে জানা যায়, চোরেরা ফোন অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মুড়ে রাখে, যাতে সিগন্যাল ব্লক হয়ে যায় এবং ট্র্যাকিং ব্যাহত হয়।

কিশোরদের ব্যবহার করছে বড় অপরাধচক্র

এই ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের বেশিরভাগই কিশোর। ও’কনরের মতে, তাদের বয়স সাধারণত ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। এমনকি ১৩ বছর বয়সী কিশোরদেরও এই কাজে জড়িত থাকতে দেখা গেছে।

গিলবার্ট বলেন, “তারা হয়তো মনে করে এটি ছোটখাটো অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে এটি বড় সংগঠিত অপরাধচক্রের অংশ।” এসব চক্র কিশোরদের ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অপরাধ পরিচালনা করে।

প্রতি ফোন থেকে চোরেরা সাধারণত ১০০ থেকে ২০০ ডলার আয় করে। গিলবার্টের ভাষায়, “১৩ বছরের একটি শিশুর জন্য এটি বড় অঙ্কের টাকা। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা গ্যাং ও আরও বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।”

পুলিশ জানায়, ওই শুক্রবার রাতের টহলে মধ্যরাতের দিকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ই-বাইকের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে চ্যালেঞ্জে পড়ছে পুলিশের গাড়ি। এ ক্ষেত্রে মোটরবাইক তুলনামূলক বেশি কার্যকর হলেও, অনেক সময় চোরেরা লাল বাতি অমান্য করেই পালিয়ে যায়।